রাজশাহীর দুর্গাপুরে দাওকান্দি সরকারি কলেজের নারী প্রদর্শক (ডেমোনেস্ট্রেটর) আলেয়া খাতুন হীরাকে অধ্যক্ষের অফিস কক্ষে প্রকাশ্যে জুতা দিয়ে পিটিয়ে আহত করেছেন স্থানীয় বিএনপির নেতারা। শুধু তাই নয়, এই ঘটনার পর স্থানীয় বিএনপির নেতারা একজোট হয়ে আবারো কলেজের অধ্যক্ষের অফিসে হামলা, ভাংচুর এবং অধ্যক্ষসহ শিক্ষক-কর্মচারীদের পিটিয়ে আহত করেন।
খবর পেয়ে দুর্গাপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বেলা আড়াইটার দিকে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার কিছু ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে মুহুর্তে সেগুলো ভাইরাল হয়ে যায়।
এদিকে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় অভিযুক্ত দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলীকে বিএনপি থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রীর রাজণৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘দলীয় নীতি, আদর্শ ও শৃঙ্খলা পরিপন্থি কার্যকলাপে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে রাজশাহী জেলার দূর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলীকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যসহ সব পর্যায়ের দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, ঘটনার সময় দাওকান্দি সরকারি কলেজে ২০২৪ সালের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছিল। কলেজটি জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের একটি পরীক্ষা কেন্দ্র। পরীক্ষার কারণে কলেজ ক্যাম্পাস ও আশপাশের ১০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি ছিল। পরীক্ষা উপলক্ষ্যে সকাল থেকেই কলেজে পুলিশ মোতায়েন ছিল।
ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, কলেজের অধ্যক্ষের অফিস কক্ষে কিছু ব্যক্তি বসে আছেন এবং সেখানে কিছু আলোচনা চলছিল। একপর্যায়ে কলেজের নারী প্রদর্শক নিজের মোবাইল ফোনে ভিডিও করছিলেন। এসময় একব্যক্তি ওই নারী প্রদর্শককে পায়ের স্যান্ডেল খুলে আঘাত করতে যান। এসময় নারী প্রদর্শক হাত দিয়ে জুতার আঘাত ফিরিয়ে ওই ব্যক্তিকে চড় মারেন। এরপর ওই ব্যক্তি পূর্ণ শক্তি দিয়ে নারী প্রদর্শককে জুতাপেটায় আহত করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলী, সিনিয়র সহ-সভাপতি আফাজ আলী, জয়নগর ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি শাহাদাত আলী, পুলিশের সাবেক এসআই ও বিএনপি নেতা আব্দুস সামাদ, কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আলী, বিএনপি নেতা এজদার আলী এবং ছাত্রদলের সাবেক নেতা রুস্তম আলী ও জামিনুর ইসলাম জয়ের নেতৃত্বে একটি দল দাওকান্দি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের অফিস কক্ষে প্রবেশ করেন। তারা স্থানীয় একটি ইসলামী জালসার জন্য অধ্যক্ষের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন।
এছাড়া তারা আগের অধ্যক্ষের সময়ে কলেজের আয়-ব্যায়ের হিসাবও দাবি করেন। এ নিয়ে বিএনপি নেতাদের সাথে অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের বাকবিতণ্ডা চলছিল। এক পর্যায়ে সেখানে উপস্থিত প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরা প্রতিবাদ জানান এবং নিজের মুঠোফোনে বাকবিতণ্ডার ভিডিও ধারণ শুরু করেন।
এসময় বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হিরাকে বাধা দিতে এগিয়ে যান বিএনপি নেতা আকবর আলী। তখন ওই প্রদর্শক হাত দিয়ে বিএনপি নেতার জুতার আঘাত ফিরিয়ে দেন এবং বিএনপি নেতাকে চড় মারতে উদ্যত হন। এরপর পায়ের স্যান্ডেল হাতে এগিয়ে এসে যুবদল নেতা শাহাদাত আলী ওই প্রদর্শককে পিটিয়ে আহত করেন।
এ ঘটনার জেরে প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরা ওই বিএনপি নেতার সাথে অধ্যক্ষের অফিস কক্ষে যাওয়া বিএনপির স্থানীয় সহ-সভাপতি আফাজকে পেছন থেকে জাপটে ধরে আটকের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
অন্যদিকে প্রদর্শককে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করার কিছুক্ষণ পর স্থানীয় বিএনপির ৪০/৫০ নেতাকর্মী সংগঠিত হয়ে কলেজের অধ্যক্ষের অফিস কক্ষে হামলা চালান। তারা অধ্যক্ষ ও শিক্ষক কর্মচারীদের মারধোরের পাশাপাশি কলেজে ভাঙচুর ও অফিস তছনছ করেন।
বিএনপি নেতাদের হামলায় কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরা, অধ্যাপক রেজাউল করিম আলমসহ কলেজের অপর দুইজন কর্মচারী আহত হন।
এদিকে হামলা, মারধোর ও ভাঙচুরের পর অব্যাহত হুমকির মুখে আত্মগোপনে রয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, নারী শিক্ষক আলেয়া খাতুন হিরাসহ কয়েকজন। ভয়ে তারা ফোন বন্ধ করে যে যার মতো করে অবস্থান করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের সাবেক এসআই আব্দুস সামাদের নেতৃত্বে বিএনপির ওই গ্রুপটি দাওকান্দি কলেজ ও দাওকান্দি স্কুল থেকে প্রতিমাসে বিভিন্ন অজুহাতে চাঁদাবাজি করেন। তারা ৫ আগস্টের পর থেকে দাওকান্দি বাজারের ব্যবসায়ীদের থেকে চাঁদাবাজি, অফিস ও পুকুল দখলসহ নানা অপকর্মে জড়িত। তারা একটা বাহিনী গড়ে দাওকান্দিতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। এই বাহিনীর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না।
অভিযোগ রয়েছে ঘটনার সময় অধ্যক্ষের অফিসে দুর্গাপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সহ পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তারা হামলাকারী বিএনপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণের কোনো চেষ্টাই করেননি। ফলে ওই নারী শিক্ষককে জুতাপেটার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা আবারো দ্বিতীয় দফায় কলেজের অধ্যক্ষের অফিসে হামলা ও ভাঙচুরসহ শিক্ষক-কর্মচারীদের পিটিয়ে আহত করে নির্বিঘ্নে কলেজ ত্যাগ করেন।
তবে দাওকান্দি কলেজে বিএনপির হামলার খবর পেয়ে দুর্গাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে কলেজে উপস্থিত হয়ে শিক্ষক ও বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
শিক্ষিকাকে জুতাপেটা ও কলেজে হামলার নেপথ্যে চাঁদাবাজি!
দাওকান্দি সরকারি কলেজের শিক্ষিকাকে জুতাপেটা, কলেজে হামলা, ভাঙচুর ও শিক্ষকদের মারধরের নেপথ্যে স্থানীয় কতিপয় বিএনপির নেতাকর্মীর চাঁদাবাজি বলে অভিযোগ উঠেছে। চাঁদার দাবিতে তারা প্রায়ই দাওকান্দি সরকারি কলেজ এবং দাওকান্দি হাইস্কুলে হানা দেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী শিক্ষকদের।
দাওকান্দি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘চার মাস আগে তিনি এই কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন গ্রুপ তার কাছে নানা অজুহাতে চাঁদা দাবি করছিলেন। তিনি এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। ভুক্তভোগী প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরা বলেন, ‘বিভিন্ন সময় কলেজে এসে তারা হিসাব চাইতেন, মূলত চাঁদার টাকার জন্যই হিসাব চাইতেন তারা। অধ্যক্ষের পাশে থেকে প্রতিবাদ করায় আমিও হামলার শিকার হয়েছি।’
অভিযুক্ত একমাত্র যুবদল নেতা শাহাদত আলী সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘কলেজের ডেমোনেস্ট্রেটর আলেয়া জনসমুখে আমার গায়ে প্রথমে হাত তুলেছেন। পরে আমিও পায়ের স্যান্ডেল দিয়ে তাকে আঘাত করেছি।’
দুর্গাপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার আগে থেকেই পুলিশ সেখানে ছিল। কিছু লোক জোরপূর্বক প্রবেশ করে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিহা ইয়াসমিন বলেন, ‘এখনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। অভিযুক্তদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে।’


