একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জাতীয় সংসদে ফের বাহাস হয়েছে। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনিত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা অংশ নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধীদলের মন্ত্রী-সংসদ সদস্যরা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রাখেন।
এর আগের দিন মঙ্গলবার মুক্তিযুদ্ধ ও জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধ ফজলুর রহমান বক্তব্য রাখলে বিরোধীদলের সংসদ সদস্য আপত্তি জানায় এবং হট্টগোল করেছিল।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা আমি ৭১ দেখেছি বর্ডারে যুদ্ধ করেছি বিলোনিয়া সীমান্তে। আজকে যারা গণতন্ত্রের শপথক দিতে চায় যারা ৭১ কে ২৪ এর সাথে সম্পৃক্ত করতে চায়, খাটো করে দেখতে চায়, তাদের একটি কথাই বলতে চাই, ভালোভাবে আচরণ করে যাচ্ছি, ভদ্রতার সাথে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে।
পাকিস্তানে গিয়েছিলাম ২০০৪ সনে জামাত ইসলামের একজন এমপি আমার সাথে গিয়েছিলেন ‘সাফমা’ কনফারেন্সে। আমি মুক্তিযোদ্ধা জেনে পাকিস্তান এসএমবির একজন এমপি জামাত ইসলামের এমপির সাথে যে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য আমাকে করেছিল। আই কান্ট ফরগেট দ্যাট সিচুয়েশন বিকজ আই ওয়াজ এ ফ্রিডম ফাইটার। কিন্তু তবু দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে চুপ করে থাকি কিছু কিছু বলি না। কিন্তু যখন বেশি বাড়াবাড়ি করে তখন বলতে ইচ্ছা করে, তোরা রাজাকার, তোরা আল সামস, তোরা আল বদর।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা মুক্তিযোদ্ধা দেশটাকে স্বাধীন করেছি। স্বাধীনতা পাওয়া সেই দেশটিকে গড়ার লক্ষে ঐক্য করতে চাই। কিন্তু আদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে নয়, আমাদের সমঝোতা দিয়ে। দেশের উন্নয়নের স্বার্থের সমঝোতা, আদর্শের সমঝোতা নয়। আমাদের বিরোধীদলীয় নেতা কালকে বলেছিলেন, উনাকে কেন এত কসলায়, মাননীয় স্পিকার আমি একটু কসলে দিতে চাই।
১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া বিএনপি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের দল
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও দলের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে কথা বলেন। আজহার একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। বক্তব্যের শুরুতে তিনি বিষয়টি উল্লেখ করেন।
এ টি এম আজহার বলেন, ‘আমি সুপ্রিম কোর্টের সর্বোচ্চ আদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলাম। যেকোনো মুহূর্তে আমার ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হতো। ঠিক সেই মুহূর্তে চব্বিশ সালের ৫ আগস্ট বিপ্লব বলি অথবা অভ্যুত্থান বলি, তার মাধ্যমে আমার মুক্তির পথ সুগম হয়।
১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া বিএনপি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের দল হতে পারে, সে প্রশ্ন তুলেছেন । তিনি বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলা হয়। বিএনপি দাবি করে মুক্তিযুদ্ধের দল; অথচ বিএনপি প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর, আর মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে ১৯৭১ সালে। বিএনপি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের দল হতে পারে। তাহলে এটা কীভাবে আমি মূল্যায়ন করব? বিএনপিতে মুক্তিযোদ্ধা আছেন, এটা আপনি বলতে পারেন। তদ্রুপ জামায়াতে ইসলামীতেও মুক্তিযোদ্ধা আছেন।’
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান দাবি করেছেন, জামায়াতে ইসলামী কার্যত নিজেদের ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ হিসেবে মেনে নিয়েছে। সংসদের চলতি অধিবেশনে পাস হওয়া সংশোধিত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনের বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞার উদ্ধৃতি দিয়ে আইনমন্ত্রী এমন দাবি করেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন, ২০২৬-এ নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সংশোধনীতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর—তৎকালীন মুসলিম লীগ, তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, তৎকালীন নেজামে ইসলামী এবং আলবদর, আলশামস বাহিনী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের যে সমস্ত দামাল ছেলে, যারা সংগ্রাম করেছেন, তাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা… আইন এই সংসদে পাস হয়েছে। সেই আইনে জামায়াতে ইসলামী কার্যত বিরোধিতা করেনি। এনসিপির পক্ষ থেকে লিখিতভাবে অনুসমর্থন জানানো হয়েছে। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বাই অপারেশন অব ল অ্যান্ড ইন্টারপ্রিটেশন, তাহলে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে কারা বিরোধিতা করেছিল, কারা খুন, গুম ও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত ছিল, কারা বাংলাদেশের অসংখ্য ও অগণিত মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল।
১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৮২ এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ২০২৪ সালের আন্দোলন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে আদর্শিক বিতর্ক বিদ্যমান। তিনি দাবি করেন, এই বিতর্কের মূল কারণ আদর্শগত পার্থক্য। ধর্ম, স্বাধীনতার চেতনা বা আন্দোলনের ইতিহাসকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। এসব বিষয় রাজনৈতিক আচরণে প্রভাব ফেলছে।
বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী মিজ আফরোজা খানম বলেছেন, জুলাই বিপ্লবকে ৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে তুলনা করা হয়, তখন এই মহান মুক্তিযুদ্ধ ছোট হয়ে যায়। বাংলাদেশ খাটো হয়ে যায়। আমরা লজ্জিত হই। মুক্তিযুদ্ধ কোন পলিটিক্যাল মেটাফর না, এটা আমাদের অস্তিত্ব।



