আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ের নির্বাচন শেষ করার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা আগেও বলেছি, এখনো বলছি। কেননা স্থানীয় সরকার হচ্ছে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। একই সঙ্গে তৃণমূলের সবচেয়ে বড় শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠান। আর এ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনের তৃতীয় দিনে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
সম্মেলনে অতিদ্রুত বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান কিভাবে করা যায়, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের প্রভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকটকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে সরকার।
সাম্প্রতিক সময়ের এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সামনের দিনে বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধানে অতিদ্রত সারাদেশের সরকারি অফিসের ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যাতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মিনিমাম পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, যেটি জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে চাহিদা অনেকাংশে মেটানো সম্ভব হবে।
লক্ষ্য অনুযায়ী অতিদ্রুত আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে জেলা প্রশাসকদের প্রতিটি সরকারি অফিসের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকার আশা করছে, সোলার প্যানেল বসানোর কাজ দ্রুত শেষ করতে পারলে বিদ্যুতের অনেক সাশ্রয় হবে এবং বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত হবে।
ডিসি সম্মেলনের তৃতীয় দিন গতকাল মোট ৯টি অধিবেশনে ১৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে ডিসিদের আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত ইস্যুগুলো আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া পৃথক অধিবেশনে বিকালে সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন জেলা প্রশাসকরা। সবশেষ সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে মতবিনিময়ের মধ্যদিয়ে তৃতীয় দিনের কর্মসূচি শেষ হয়। চার দিনের এ সম্মেলন শেষ হবে আজ বুধবার। সম্মেলনের আজ চতুর্থ ও শেষ দিনেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগসংক্রান্ত ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হবে এবং সবশেষ রাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডিনারের মধ্যদিয়ে শেষ হবে এবারের ডিসি সম্মেলন।
এক বছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ হবে : স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ের নির্বাচন শেষ করা হবে। জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে আলোচনা শেষে তিনি বলেন, ডিসিরা আমদের কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। আমরা প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করেছি।
জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ডিসিদের কাজ করতে হবে জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্ব দিতে হবে। সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাদের কাজ করতে হবে। অর্থাৎ জনগণকে সঙ্গে নিয়েই ডিসিদের কাজ করতে হবে। কারণ জনগণই হচ্ছে এই দেশের মালিক। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে স্থানীয় সরকারে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। সেসব বিষয় মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে আমরা তদন্ত করবো। একইসঙ্গে সেগুলো যেন ভবিষ্যতে না ঘটে, সেটাও দেখবো।
অফিসের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনে ডিসিদের নির্দেশ : আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সৌর বিদ্যুৎ পাঁচ হাজার মেগাওয়াট উন্নীত করার জন্য সরকারি প্রতিটি অফিসের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
ডিসিদের সঙ্গে আলোচনা শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ডিসিদের নির্দেশনা দিয়েছি, অতি দ্রুত, সোলারের মাধ্যমে আমাদের পাঁচ বছরে মিনিমাম ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্ল্যান আছে। সেটা বাস্তবায়নের জন্য জেলার প্রত্যেকটা অফিসের রূফটপে (ছাদে সোলার প্যানেল) লাগানোর জন্য বলা হয়েছে।
আমাদের ক্যাবিনেট ডিভিশন থেকেও ডিসিদেরকে যা অর্থ দরকার, অর্থের জোগান দিয়েছে। তাদেরকে অতিদ্রুত আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এটা শেষ করার জন্য অনুরোধ করেছি। আশা করি, কাজটা শেষ করতে পারলে আমাদের বিদ্যুতের অনেক সাশ্রয় হবে।
অবৈধভাবে দখল করা সরকারি জমি উদ্ধার করতে হবে : ভূমির অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম, খেলার মাঠ, পার্ক ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল রক্ষণাবেক্ষণ করতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
ডিসিদের সঙ্গে আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, বিভিন্ন জেলার সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আবাসন সমস্যা নিরসনে ডরমেটরি ও স্টুডিও এপার্টমেন্ট নির্মাণ এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমের জন্য সমন্বিত অফিস নির্মাণ ও বিদ্যমান অফিস ভবন সংস্কারসহ নতুন ভবন নির্মাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নতুনভাবে প্রণীত সরকারি ক্রয় বিধি অনুসরণ ও বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, রাজউক, বিভাগীয় শহরসমূহের প্রতিষ্ঠিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগীতা একান্তভাবে কামনা করেছি।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও গবেষণায় কাজ করছে সরকার : মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ, গবেষণা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও কল্যাণ নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার। তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন। এই অর্জনকে আমরা লালন করি এবং ধারণ করি। এই অর্জনকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
তিনি বলেন, এই মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্বাধীনতার স্মৃতি সংরক্ষণ, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন, ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এসব কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীকে জনমুখী করতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা : সশস্ত্র বাহিনীকে জনমুখী করতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামসুল ইসলাম।
ডিসিদের সঙ্গে আলোচনা শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাদের বাহিনীর প্রধানদের যে চাওয়া, কর্মপদ্ধতি, পরিকল্পনাসহ আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে জেলা প্রশাসকদের অবহিত করা হয়েছে। সরকারের দায়বদ্ধতার অবস্থান থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে জনমুখী বাহিনীতে পরিণত করার জন্য জেলা প্রশাসকদের যে অবস্থান থাকার কথা সেই দিকনির্দেশনা আমরা দিয়েছি।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী পেশাদারত্ব ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সেনাবাহিনীতে যেন আমরা শক্তিশালী জনবল সম্পৃক্ত করতে পারি। এই ব্যাপারে জেলা প্রশাসকদের কী ভূমিকা থাকতে পারে সে বিষয়ে আলোচনা করেছি। নির্বাচনে সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসক এবং সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের যে রোল ও হারমনিতে (সম্প্রীতি) কাজ করেছে সেই হারমনি আরও কীভাবে শক্তিশালী করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানরা অংশ নেন।
অবৈধ অভিবাসন রোধে ডিসিদের ভূমিকা রাখার আহ্বান : অবৈধ অভিবাসন রোধ, দালাল চক্রের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, প্রতিবেশী দেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতেই চলবে দেশের পররাষ্ট্রনীতি। ডিসিদের সঙ্গে আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
অবৈধ অভিবাসন রোধে জেলা প্রশাসকদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের নাগরিকরা যেন বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে বিপদে না পড়েন বা মৃত্যুর মুখে পতিত না হন, সেটি রোধ করতে ডিসিদের বড় ভূমিকা রয়েছে। সাধারণ মানুষ যেন এ ধরনের ফাঁদে পা না দেয়, সে বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক জাগরণ তৈরিতে তাদের কাজ করতে হবে।
ডিসিদের সর্বক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান : এদিকে, পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বিকালে ডিসি সম্মেলনের একটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সুপ্রীম কোর্ট অডিটোরিয়ামে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সঙ্গে এই জেলা প্রশাসকদের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বিশেষ দিকনির্দেশনা প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি ডিসিদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। ডিসিদের রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ ও সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, জনগণ, সমাজ, রাষ্ট্র, সৃষ্টিকর্তা সর্বোপরি নিজের বিবেকের কাছে আমাদের যে দায়বদ্ধতা আছে তা সর্বদা স্মরণ রেখে সর্বক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের বিচারপতিবৃন্দ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল উপস্থিত ছিলেন।



