হামে এক দিনে ১২ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৯২

দেশব্যাপি হামের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকহারে চলছে। একইভাবে শিশুদের মৃত্যু এবং আক্রান্তের হারও বেড়েই চলছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৮ টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘন্টায় রাজধানীসহ দেশব্যাপি হামে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৪ জন এবং হাম উপসর্গে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রন কক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, হামে আক্রান্ত হয়েছে ১১৯২ জন এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ১১১ জন।

১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত মোট হামের রোগীর সংখ্যা ৫৫ হাজার ৬১১ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত হামের রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৪১৬ জন। হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজার ১৭৬ জন। হাসপাতাল থেকে ৩৬ হাজার ৫৫ জন ছাড়পত্র পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন। হামে ৪৫১ জন শিশুর মৃত্যুর মধ্যে ৭৪ জন নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে। ৩৭৭ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে।

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রনে আসতে আগামী জুন মাসের প্রথম দিক থেকে শুরু হতে পারে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ প্রভাত চন্দ্র সরকার জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শিশু মৃত্যুর মধ্যে নিউমোনিয়া মৃত্যুর হার সর্বাধিক। ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়।

স্বাস্থ্যের মহাপরিচালক বলেন, ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। শতভাগ টিকাদান কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। এই কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে। এ টিকাদান কার্যক্রমের বাইরে কিছু কিছু শিশু বাদ পড়েছে। তাদের খুঁজে বের করে টিকা দেয়া হচ্ছে। টিকাদান কর্মসূচি চলমান। তার মতে টিকা দেয়া তিন থেকে চার সপ্তাহের পর থেকে হামে আক্রান্ত শিশুর দেহে এন্টিবডি তৈরি হতে সময় লাগে। প্রথমে ১৮ টি জেলা ও ৩০ টি উপজেলায় হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। সেসব জেলা ও উপজেলা প্রথমেই টিকা দেয়া হয়। বর্তমানে ওইসব জেলা-উপজেলায় হামের কোনো প্রাদুর্ভাব নেই। কোনো মৃত্যুর তথ্যও পাওয়া যায়নি।

আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মাহমুদুর রহমান বলেন, হামের টিকা দেয়ার পর তিন ও চার সপ্তাহের মধ্যে হামে আক্রান্ত শিশুদের দেহে ইউমিনেটি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) তৈরি হয়। টিকা দেওয়ার আগে শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। শিশুদের মৃত্যুর মধ্যে নিউমোনিয়ার হার হল সবচেয়ে বেশি। হামে যেসকল শিশু মারা যায়, তাদের দেহে পুষ্টির ঘাটতি থাকে। ভিটামিন-এ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থাকে। এ কারণে ওই সকল শিশুদের সময়মত টিক দেয়া অতীব জরুরি বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ মোসতাক হোসেন বলেন, হাসপাতালের বাহিরে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তের মধ্যে নিউমোনিয়ার হার বেশি। তাদের বেশিরভাগের আইসিইউ’র প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের পক্ষে চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর আইসিইউ হামে আক্রান্ত শিশুদের সুচিকিৎসার্থে ব্যবহার করার জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিতে পারে। ৯০ ভাগ শিশু সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আসে। সময়মত শিশুরা আইসিইউ সাপোর্ট পায়নি। তারাই বেশিরভাগ নিউমোনিয়া আক্রান্ত হচ্ছে। পরবর্তীতে মারা যায়।

তিনি বলেন, বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে শিশুরাই হামে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। জ্বর হলে শিশুদের স্থানীয় উপজেলা অথবা জেলা সদর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ি ব্যবস্থাপত্র নিতে পারে। এজন্য দেশব্যাপি হামের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো হলে শিশুরা দ্রæত সুচিকিৎসা পাবে বলে তিনি জানান।

শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শফি আহমেদ মোয়াজ বলেন, গ্রামে বেশিরভাগ বাড়ছে হার্ড ইমিউনিটি। সামনে শুরু হওয়ার আশঙ্কা ডেঙ্গর প্রদুর্ভাব। দুটি মিলিয়ে পরিস্থিতি বেসামাল হওয়ার আশংকা রয়েছে।

তিনি বলেন, হাম একটি শক্তিশালী ছোঁয়াচে রোগ। আক্রান্তদের মধ্যে গ্রামে হামে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। রাজধানীর হাসপাতালের মধ্যে চিকিৎসাধীন শিশুদের মধ্যে ৭০ ভাগই ঢাকার বাহিরের বলে তিনি জানান।

শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, প্রতিবছর ৫ বছর বয়সীর শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২৪ হাজার মারা যায়। মারা যাওয়া ৪ জন শিশুর মধ্যে একজন নিউমোনিয়ায় যা মৃত্যুর ১ ভাগ বলে তিনি জানান। হামে আক্রান্ত হওয়া শিশুরা মারা যায়। গড়ে মৃত্যুর হার একই বলে তিনি জানান।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মাহবুবুল হক বলেন, হামের পর শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। হামের আগে কোনো কোনো শিশু অন্য রোগে আক্রান্ত ছিল। ওইসকল শিশুদের দেহে নতুন করে যুক্ত হয়েছে হামের ভাইরাস। এইসকল শিশুরাই নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের জটিলতায় মারা যাচ্ছে বেশি। টিকাদান কার্যক্রম শেষ হয়েছে। সামনে থেকে হামে আক্রান্তের হার কমে আসবে বলে তিনি জানান।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments