দেশে বন্ধ কলকারখানা চালু করাসহ স্থবির অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা হবে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে যোগান দেওয়া হবে।
প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন হলে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকাল শনিবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্যাকেজ ঘোষণা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। দুপুরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম সম্মেলন কক্ষে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ডেপুটি গভর্নরসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ঘোষিত প্যাকেজের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন হবে দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের কোম্পানি সচল করতে। আর ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পে (সিএসএমই) অর্থায়ন হবে ৫ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়া কৃষি খাতে ১০ হাজার কোটি, রফতানিতে বৈচিত্র সৃষ্টিতে ৩ হাজার কোটি, উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে ৩ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন করা হবে বলে গভর্নর জানিয়েছেন। ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে গঠিত এ তহবিলের মেয়াদ হবে সর্বনিম্ন ৩ বছর। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে গঠিত ১৯ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজে সরকার গ্যারান্টি দিবে।
এ তহবিল থেকে প্রি-শিপমেন্ট খাতে ৫ হাজার কোটি, সিএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি, চামড়া পণ্য ও জুতা রফতানিতে ২ হাজার কোটি টাকা, বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ১ হাজার কোটি টাকা, গ্রামীণ অর্থনীতি প্রণবন্ত করতে ১ হাজার কোটি টাকা, হিমাহিত চিংড়ি ও মাছ রফতানি খাতে ২ হাজার কোটি টাকা, গ্রিন ইকো-ফ্রেন্ডলি তহবিলে ১ হাজার কোটি টাকা, বিদেশে কর্মসংস্থান খাতে ১ হাজার কোটি টাকা, স্টার্ট-আপে ৫০০ কোটি টাকা এবং ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে ৫০০ কোটি টাকা যোগান দেওয়া হবে।
গভর্নর জানান, প্রণোদনা প্যাকেজের ভিত্তি সুদহার হবে ১০ শতাংশ (নীতি সুদহার)। এর সঙ্গে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত ৩ শতাংশ সুদ যুক্ত করে ঋণ বিতরণ করতে পারবে। এক্ষেত্রে ঋণের সুদহার হবে সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ। তবে এ সুদের মধ্যে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসাবে পরিশোধ করবে। বাকি ৭ শতাংশ সুদ পরিশোধ করবে গ্রাহক। অর্থাৎ, গ্রাহক পর্যায়ে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের সুদহার হবে ৭ শতাংশ।
ঋণ প্যাকেজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত সার্কুলার দেওয়া হবে। তখন জানতে পারবেন। বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেছেন, ব্যাংকিং খাতের এক তৃতীয়াংশ টাকাই নাই হয়ে গেছে। চুরি যাওয়া এসব অর্থের অধিকাংশ টাকাই দেশের বাইরে পাচার হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমরা এমন পরিস্থিতিতে আসছি, যখন ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়ে গেছে। ব্যাংকিং সিস্টেমের এক তৃতীয়াংশ টাকাই নাই, যেটাকে আমরা ‘সফিসটিকেটেড’ ভাবে খেলাপি ঋণ বলছি। এর অংশ চুরি হয়ে গেছে, এর বিপরীতে কোনো জামানত নাই।
খেলাপি ঋণ কমাতে ‘অ্যাসেট রিকোভারি নিয়ে কাজ করছি’ মন্তব্য করে গভর্নর বলেন, যে ১০০ টাকা নিয়েছে, তার কাছে কিন্তু একশত টাকা নাই। আমরা এখন কাজ করছি এই টাকা কীভাবে আদায় করা যায়।
বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার আগে একক গ্রাহক ঋণ সীমা বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এছাড়াও গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করতে ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে বিশাল অঙ্কের ঋণ সুবিধা বাড়ালে মূল্যস্ফীতি বাড়বে কিনা, সেই প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, একক ঋণগ্রহীতার ‘এক্সপোজারটা’ কোথায়, তা আপনারা জানেন।
তিনি বলেন, এ কারণে আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে, তার (গ্রাহকের) সীমা বাড়ানো দরকার। এর মানে এই না যে, ব্যাংক ঋণ দিয়ে দিবে। আমরা প্রত্যাশা করি, ব্যাংক ভালো গ্রাহককে দেবে। গভর্নর বলেন, প্রণোদনার জন্য অতিরিক্ত কোনো টাকা ছাপানো হবে না।
এটা ব্যাংকিং খাতের টাকা, ব্যাংক থেকেই দেওয়া হবে। কিছু ব্যাংকের অতিরিক্তি তারল্য আছে, তা ঋণ দিয়ে আবার ব্যাংকে ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করব, লু-ফলসগুলো যেনো ঠিক করা হয়, তা সার্কুলারের মাধ্যমে জানানো হবে।
বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ৫ শতাংশের নিচে নেমেছে। অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এখন ঋণ প্যাকেজ না দেওয়া ছাড়া উপায় নেই বলে মনে করেন গভর্নর। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের হাতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল (চলতি মূলধন) ড্রাই হয়ে গেছে। তাদের কাছে টাকা নাই। অর্থনীতি যে অবস্থায় আছে, এই মুহূর্তে এটা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো চয়েস নাই। ইকোনোমি বুস্ট করার জন্য করতে হয়েছে।



