রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনআইডি, পাসপোর্ট ও জন্মসনদ জালকারী চক্র সক্রিয়

কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে জাল জাতীয় পরিচয়পত্র, বৈদেশিক মুদ্রা ও বিভিন্ন সনদপত্রসহ মোহাম্মদ তোহা নামে এক রোহিঙ্গার গ্রেপ্তারের ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে ক্যাম্পভিত্তিক জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি, মানবপাচার ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক। বেশ কয়েকটি চক্রের সদস্য গ্রেফতার হলেও কোনোভাবে এই অপরাধ কার্যক্রম রোধ করতে পারছে না আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।

আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তথ্য অনুযায়ি, গত ১৫ মে উখিয়ার লাম্বাশিয়া-১ ক্যাম্প থেকে আটক মোহাম্মদ তোহার কাছ থেকে বাংলাদেশি টাকা, মার্কিন ডলার, মালয়েশিয়ান রিংগিত ও সৌদি রিয়ালের পাশাপাশি বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়ের বিভিন্ন নথি উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে জাল এনআইডি ব্যবহার, জাল জন্ম নিবন্ধন সনদ, মানবপাচার, মানিলন্ডারিং এবং ভুয়া পাসপোর্ট তৈরির চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় উখিয়া থানার এসআই আব্দুল হামিদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। এই মামলাটি তদন্ত করছেন উখিয়া থানার এসআই ইয়ামিন সুমন। গতকাল তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে মোহাম্মদ তোহা বিভিন্ন প্রতারণামূলক উপায়ে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া এলাকার একটি ঠিকানা ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন।

পরে তিনি নিজেকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি মিলেছে। তার মোবাইল ফোনের ফরেনসিক রিপোর্ট পেলে আরো বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রোহিঙ্গাদের মধ্যে জাল এনআইডি তৈরি ও বাংলাদেশি পরিচয় গ্রহণের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল সিম নিবন্ধন, পাসপোর্টের আবেদন এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের সুযোগ পেয়ে থাকে।

তবে পুলিশ বলছে, এসব অভিযোগে মোহাম্মদ তোহা গ্রেফতারের ঘটনা এটি প্রথম ঘটনা নয়। ২০২১ সালে কক্সবাজারের চকরিয়ায় অভিযান চালিয়ে ওসমান গনি নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব। তার কাছ থেকে সাতটি জাল পাসপোর্ট, সাতটি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ভুয়া জন্মসনদ তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও এনআইডি তৈরির কাজ করতেন।

নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গাদের একটি অংশ দালালচক্রের মাধ্যমে ভুয়া জন্মনিবন্ধন, এনআইডি ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস ও বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে থাকে।

সম্প্রতি টেকনাফের জাদিমুরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকা থেকে প্রায় এক কোটি টাকার জাল নোটসহ একটি চক্রের দুই সদস্যকে আটক করে বিজিবি। তাদের একজন ছিলেন রোহিঙ্গা। অভিযানে ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ওয়াটারমার্ক তৈরির সরঞ্জাম ও জাল নোট তৈরির বিভিন্ন উপকরণ উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীদের মতে, ঈদকে কেন্দ্র করে এসব জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

পুলিশ আরো জানায়, গত কয়েক বছরে একাধিক অভিযানে বিদেশি পাসপোর্টসহ রোহিঙ্গা নাগরিকদের আটক করা হয়েছে। ২০২৪ সালে কক্সবাজারে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ৬৩ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে ১৯টি বিদেশি পাসপোর্ট জব্দের তথ্য প্রকাশ্যে আসে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মানবপাচার চক্র মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর জন্য রোহিঙ্গাদের ভুয়া পরিচয়পত্র সরবরাহ করে থাকে।

শুধু জাল নথি নয়, ক্যাম্পগুলোতে অস্ত্র উদ্ধার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। ২০২৫ সালে উখিয়ার একটি ক্যাম্প থেকে বিদেশি তৈরি উজি সাবমেশিনগান ও নগদ অর্থসহ চারজন সন্দেহভাজন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যকে আটক করা হয়। তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও সীমান্তভিত্তিক অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে।

সম্প্রতি পুলিশের একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ক্যাম্পভিত্তিক কিছু সংঘবদ্ধ চক্র রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাদের মানবপাচারের শিকার হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জাল এনআইডি, ভুয়া পাসপোর্ট, মানবপাচার, জাল মুদ্রা ও অবৈধ আর্থিক লেনদেন সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি এনআইডি ও জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থায় কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

টেকনাফ-উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এপিবিএনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জাল এনআইডি, জাল জন্ম নিবন্ধন সনদ দিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব তৈরি করা চক্রের বিস্তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। পরিচয় গোপন করে বাংলাদেশি নাগরিকত্বের সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments