চট্টগ্রামের আনোয়ারায় হবে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামোর উন্নয়নসহ পাঁচ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। একনেক চেয়ারপার্সন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত চলতি অর্থবছরের ১৩তম একনেক সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে নতুন ৩টি এবং সংশোধিত ২টি রয়েছে।

সভা শেষে রাজধানীর আগারগাস্থ এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি জানান, পরিবেশগত সমস্যা সমাধান এবং প্রকল্পের নকশায় টেকসই জ্বালানি সমাধান অন্তর্ভুক্ত করার শর্তে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের জন্য সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্প’ অনুমোদন করা হয়।

চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে সবুজ ও টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

একনেক সভায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘সাপোর্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট ফর চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই ব্যয়ের মধ্যে মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল হতে ১৭২২ কোটি ১৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। বাকি ২৪৬৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা প্রকল্প ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে।

প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি জানান, প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থা আরো জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাসমূহকে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। তিনি আধুনিক পরিবেশগত মান ও প্রটোকল অনুসরণ করে শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। একটি আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপনের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিশোধনের পর শোধিত পানি যেন পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করা হয়।

তিনি মূল প্রকল্প প্রস্তাবের ত্রুটিগুলো দূর করে প্রকল্প নকশায় কোনো পরিবেশগত ঘাটতি যাতে না থাকে তা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। এছাড়া প্রকল্পে সৌরভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পুরো শিল্পাঞ্চলে সৌর প্যানেল স্থাপনেরও নির্দেশনা দেন তিনি। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত পানি শোধন ও পুনর্ব্যবহার সুবিধা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংযুক্তি সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। বেজা সূত্রে জানাগেছে, প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ১,২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক, ১,১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক, ২০,৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন পানি সংরক্ষণাগার, ৪.২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন, ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বহুমুখী জেটি, ৬০ টন দৈনিক সক্ষমতার সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন, প্রায় ১২ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন নির্মাণ।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ডিসেম্বর ২০৩১ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর জি-টু-জি ব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে। ডেভেলপার চুক্তি স্বাক্ষর হলে মূল অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু হবে।

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং কমপক্ষে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আহরণের সুযোগ তৈরি হবে বলে বেজা আশা করছে।

সাংবাদকিদের ব্রিফিংকালে পরিকল্পান প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার শুধু দুর্নীতিই করেনি, দুর্নীতির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয়ও করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এবং নানা কারণে পিছিয়ে পড়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যেসব প্রকল্পে ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেগুলো দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা হবে।

অন্যদিকে কম অগ্রগতি হওয়া প্রকল্পগুলো পুনর্বিবেচনা করে নতুন প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘসূত্রিতা, অপচয় এবং অনিয়মের কারণ অনুসন্ধানে সরকার নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন। অতীতে যেসব প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে ছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে কারা দায়ী, কেন ব্যয় বেড়েছে, কেন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি এবং কোথায় কোথায় অপচয় বা ব্যর্থতা ঘটেছে, সেসব বিষয়ে তদন্ত করা হবে। দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

একনেক সভায় পাঁচ প্রকল্প অনুমোদন: একনেক সভায় অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘সাপোর্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট ফর চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ প্রকল্প।

এছাড়া পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘ফেনী জেলাধীন মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (১ম পর্যায়)’ প্রকল্প, ‘করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন’ প্রকল্প এবং ‘পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলাধীন তালবাড়িয়া এবং কুমারখালী উপজেলাধীন শিলাইদহ ইউনিয়নের কোমরকান্দি এলাকা রক্ষা (১ম সংশোধন)’ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

একইসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘১০০টি উপজেলায় ১টি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন (৩য় সংশোধিত)’ প্রকল্পও একনেকের অনুমোদন লাভ করেছে।

সভায় পরিকল্পনা মন্ত্রী কর্তৃক ইতিমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় সম্বলিত ৪টি প্রকল্প সর্ম্পকে একনেক সভায় অবহিত করা হয়। সেগুলো হলো বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি কক্সবাজারে বিমানসেনা ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প, নৌবাহিনী স্কুল এন্ড কলেজ সাভার স্থাপন প্রকল্প, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী স্টেশন শমসেরনগর বিদ্যমান বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়ন ও শিক্ষাদান সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প এবং প্যাগোডাভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক ও ক্রিপিটক শিক্ষা কার্যক্রম ৪র্থ পর্যায় প্রকল্প।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments