গলির মাস্তান ‘কাইল্যা’ পলাশের বিরুদ্ধে ৩৯ খুনের অভিযোগ

এক সময় গলির মাস্তান নামে পরিচিত ছিল মোহাম্মদ ইয়াছিন আলী খান পলাশ। তখন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফাইভ স্টার গ্রুপ ও সেভেন স্টার গ্রুপ রাজধানীর এলাকা দুই ভাগে বিভক্ত করে চাঁদাবাজি, খুনোখুনি ও দখলবাজি নিয়ন্ত্রিত হত। রামপুরা টিভি সেন্টারের পাশের গলিতে ৩৭২, ডিআইপি রোড, পূর্ব রামপুরা, উলন এলাকায় পলাশের পৈত্রিক তিন তলা বাড়ি। ওই বাড়ির পাশেই দুইটি ভবনে গার্মেন্টস ছিল। ওই দুই গার্মেন্টেসের ঝুট নিয়ন্ত্রক ছিল পলাশ।

সেটি ১৯৯৭ সালের কথা। পলাশ নামে রামপুরায় অন্তত ১০/১৫ জন ছিল যারা গলির মাস্তান বাহিনীতে জড়িত ছিল। একাধিক ব্যক্তির একই নাম হওয়ার কারণে তিনি নিজেই মানুষকে বলতেন, আমি কাইল্যা পলাশ। এরপর থেকে কাইল্যা পলাশ নাম ছড়িয়ে পড়ে রামপুরা এলাকায়। রামপুরায় তখন শতাধিক গার্মেন্টস ছিল। এসব গার্মেন্টেসের ঝুট নিয়ন্ত্রন করতে থাকে পলাশ।

পলাশের সঙ্গে বিরোধ বাঁধে মীরবাগের বড় রাইছের ভাইগ্না স্বপনের সাথে। স্বপন রামপুরার বেশ কয়েকটি গার্মেন্টেসের ঝুট নিয়ন্ত্রন করতে চায়। এরপরই এক দুপুরে মীরবাগে পলাশ তার দুই সহযোগীকে নিয়ে পিস্তল দিয়ে গুলি করে স্বপনকে হত্যা করে। দিনে দুপুরে দুই হাতে পিস্তল থেকে গুলি করে দেখে অনেকের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় কাইল্যা পলাশের নাম ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে উচ্চারিত হতে থাকে।

পুলিশের নথির তথ্য উল্লেখ করে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তার বিরুদ্ধে ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ৩৯ জন খুনের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে মতিঝিল টিএন্ডটি কলোনীতে টিয়া লিটনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করার ঘটনাটি ছিল আলোচিত।

এরপর রামপুরার পলাশবাগে নবু মার্ডার, মালিবাগে সুব্রত বাইনের সহযোগী মাহবুব হত্যা, রামপুরায় মাস্টার ফেল নামে এক প্রতিপক্ষকে হত্যা, মতিঝিলে ট্রাফিক পুলিশকে গুলি করে হত্যা, রামপুরায় মুফতি মসজিদ গলিতে এক গার্মেন্টস শ্রমিককে গুলি করে হত্যা, রামপুরায় জিসান গ্রুপের আনোয়ার হত্যাসহ ৩৯ জনকে খুনের অভিযোগ রয়েছে। এসব খুনের ঘটনায় কোনো না কোনোভাবে কাইল্যা পলাশ জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার আটদিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে কাইল্যা পলাশ। শুক্রবার দিবাগত রাত পৌনে ১টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর চলতি বছরের ৭ মে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি। মুক্তির মাত্র এক মাসের মাথায় প্রতিপক্ষের গুলিতে তার জীবনাবসান ঘটল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার এবং দীর্ঘদিনের শত্রুতার জেরেই এই হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার নেপথ্যে পলাতক তেইশ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম জিসান আহমেদ মন্টি ওরফে জিসান গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। জিসান বর্তমানে দুবাইয়ে পলাতক জীবনযাপন করছেন।

গত ১২ জুন জুমার নামাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে রামপুরার বিটিভি ভবনের বিপরীত পাশের সড়কে হামলার শিকার হন কাইল্যা পলাশ। আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে তিনটি গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার করে মাথা থেকে একটি গুলি অপসারণ করা হলেও তিনি আর জ্ঞান ফেরেননি।

পরবর্তীতে ১৪ জুন উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করে স্বজনরা। সেখানেই টানা কয়েকদিন কোমায় থাকার পর শুক্রবার রাতে তার মৃত্যু হয়। পরে শনিবার সকালে শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। পরে পুদুরে পলাশের মরদেহ পশ্চিম রামপুরার বাসায় নেওয়ার পর বিকালে ডিআইটি রোডের মক্কি মসজিদে জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

হামলার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার দুই:
পলাশের ওপর হামলার ঘটনায় তার স্ত্রী মাহমুদা খানম হাতিরঝিল থানায় হত্যা চেষ্টা মামলা দায়ের করেন। মামলায় বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ মন্টি ওরফে জিসান এবং তার সহযোগী গুজা বাদশা, গলদা বাদশা, পিচ্চি শান্ত, সোলাইমান খন্দকার, ফারুক, হেবেল, মোল্লা জনি, ফিরোজ মোল্লা, তোতলা আলামিন ও সজীবসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৭ থেকে ৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। পলাশের মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হামলার পর শ্যুটারকে মোটরসাইকেলে করে পালাতে সহায়তার অভিযোগে ১৩ জুন বাড্ডা এলাকা থেকে মো. ইমাম হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ১৫ জুন মধুবাগের উত্তর নয়াটোলা এলাকা থেকে মো. মারুফ সুলতান ওরফে ফেরদৌসকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরে তাদের থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার দুজনই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

পরিকল্পিত হামলার ইঙ্গিত: তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, হামলায় পাঁচ থেকে ছয় সদস্যের একটি দল অংশ নেয়। তাদের মধ্যে মামুন ও রনি ব্যাকআপ টিমের শ্যুটার ছিল। আর ইমন নামে এক সন্ত্রাসী সরাসরি কাইল্যা পলাশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। হামলার পর শ্যুটারকে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে ছিল ইমামের।

তদন্তকারীদের ধারণা, হামলাটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। পলাশের গতিবিধি আগে থেকেই নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। জুমার নামাজ শেষে ফেরার সময়কে টার্গেট করেই হামলাকারীরা সুযোগ নেয়। প্রাথমিক তদন্তে হামলাকারীদের জিসান গ্রুপের সদস্য বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।

পুরোনো শত্রুতার জের : ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে, ২০০২ সালে রামপুরায় যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজান হত্যা এবং পরবর্তী সময়ে আনোয়ারুল নামে আরেক ব্যক্তিকে হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে জিসান গ্রুপের সঙ্গে পলাশের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। এছাড়া কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পলাশ আবারও এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কারাগারে থেকেও ছিল প্রভাব:
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালের ২৯ মে রামপুরায় যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজান হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন কাইল্যা পলাশ। বিচারিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরে উচ্চ আদালত সেই সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

যুবদল নেতা মিজান ছিলেন রামপুরার মীরবাগের বড় রইছের আপন চাচাতো ভাই। বড় রইছের ভাইগ্না স্বপন হত্যার পর যুবদল নেতা মিজান কাইল্যা পলাশের চাঁদাবাজির এলাকা নিয়ন্ত্রন নেয়ার চেষ্টা করে। ওই দ্বন্দ্বেই কাইল্যা পলাশ মিজানকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে।

মিজান হত্যার ঘটনাটি এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে একজন ডিবি কর্মকর্তা বলেন, মিজানের বাড়ির সামনে তাকে গুলি করার পর কাইল্যা পলাশ পালিয়ে যায়। পরে যখন জানতে পারেন মিজান বেঁচে আছেন, তখন মোটরসাইকেলে করে আবারও মিজানের বাড়ি সামনে চলে আসেন। তখন মিজানকে একটি বেবিট্যাক্সিতে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হচ্ছিল। কাইল্যা পলাশের দলবদল বেবিট্যাক্সি ঘেরাও করে ব্রাশফায়ার করে হত্যা নিশ্চিত করে বীরদর্পে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

যেভাবে গ্রেপ্তার হয় কাইল্যা পলাশ :
যুবদল নেতা মিজান হত্যার পর সরকারের উচ্চমহলে তোলপাড় হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে ডেকে হত্যাকারী যেই হোক, তাকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের পর পুলিশ কাইল্যা পলাশকে ধরতে অন্তত ১২ বার অভিযান চালায়। প্রতিবারই ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ ২০০২ সালের অক্টোবর মাসে পুলিশের একটি টিম এক রাতে হাজির হয় কুমিল্লার বার্ডে।

পুলিশের কাছে খবর ছিল যে কাইল্যা পলাশ কুমিল্লার বার্ডের ভিতরে কোনো একটা রেস্ট হাউসে আত্মগোপন করে আছেন। ওই সময় কুমিল্লা বার্ডের ভিতর পুলিশ ঢুকে অভিযান চালানো দুঃসাধ্য। এ কারণে পুলিশ পাশেই কুমিল্লা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের সহায়তা নেয়। এরপর মিলিটারি পুলিশের সহায়তায় পুলিশ পলাশকে আটক করে ঢাকায় নিয়ে আসে।

কারাগারে থাকলেও বাইরে ছিল যোগাযোগ ঃ
২০০৩ সালে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকলেও তার প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার। সহযোগীদের মাধ্যমে এলাকায় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। কারাগারে মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং আদালতে হাজিরার ফাঁকে বাসায় যাতায়াতের অভিযোগ নিয়েও একসময় আলোচনা হয়েছিল। এমনকি এ-সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তদন্তও করেছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments