রাজশাহীতে দুই জুয়েলার্সের মাঝের দেয়াল কেটে একটিতে দূর্ধর্ষ চুরির ঘটনার তিনদিনেও কোনো গ্রেপ্তার এবং চুরির স্বর্ণ উদ্ধার হয়নি। অন্যদিকে সুরক্ষিত এলাকার ওই জুয়েলার্সে চোরের প্রবেশ নিয়ে সৃষ্ট রহস্যের জটও খুলেনি। নগরীর সাহেব বাজার স্বর্ণপট্টির ভুক্তভোগী ‘কারুশ্রী জুয়েলার্সে’ এবং পাশের ‘আফিয়া জুয়েলার্সে’ লাগানো তালা অক্ষত রয়েছে। দুই জুয়েলার্সে’র মালিকের পাল্টাপাল্টি কথাবার্তায় রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। পুলিশ এখনো এই রহস্যের জট খুলতে পারেনি।
ভুক্তভোগী কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক পুলিশকে বলেছেন, ‘পাশের দোকান থেকে মাঝের দেয়াল কেটে চোরেরা চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে।’ অন্যদিকে পাশের আফিয়া জুয়েলার্সে’র মালিক পুলিশকে বলেছেন, ‘যে দোকানে চুরি হয়েছে, সেইদিক দিয়েই তাঁর দোকানের দিকের দেয়াল কাটা হয়েছে।’ উভয়েল পাল্টাপাল্টি কথাবার্তায় পুলিশ রীতিমত ধন্ধে পড়ে গেছে বলেই মনে করছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, পাশাপাশি দু’টি জুয়েলার্স দোকানেরই শাটারের তালা অক্ষত থাকায় কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না পুলিশ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগরীর বোয়ালিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এস.আই) মাসুদ কবির বলেন, ‘আমরা দুই দোকানের মালিকের সঙ্গেই কথা বলেছি। কেউই আমাদের সন্দেহের বাইরে নন। তদন্ত চলছে। আশা করছি দ্রুত রহস্য উদ্ঘাটন হবে।’
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত সময়ে সাহেব বাজার স্বর্ণপট্টির কারুশ্রী জুয়েলার্সে এই দূর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটে। প্রায় ২০ বছর ধরে স্বর্ণের ব্যবসা পরিচালনা করছেন শেখের চক এলাকার ভুক্তভোগী তূর্য সরকার ও তার সহোদর ইমন সরকার। তারা বলেন, ‘চোরেরা তাদের জুয়েলার্স থেকে প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ ও ১ হাজার ২০০ ভরি ওজনের রুপার অলংকার এবং ২০ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। চুরি হওয়া স্বর্ণালংকারের মূল্য প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, চুরির শিকার ‘কারুশ্রী জুয়েলার্স’ তিনতলা ভবনের নিচতলায়। ভবনের নিচতলার সবগুলোই জুয়েলার্সের দোকান। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় আবাসিক হোটেল। কারুশ্রীর পাশের দোকান আফিয়া জুয়েলার্স। তার পাশ দিয়ে আবাসিক হোটেলে প্রবেশের সিঁড়ি। আবাসিক হোটেলের কারণে সিড়িটি সবসময় খোলা থাকে।
শনিবার সকালেও অণ্যান্য দিনের মত কারুশ্রী ও আফিয়া জুয়েলার্সের শাটারের সবগুলো তালা লাগানোই ছিল। কিন্তু তূর্য সরকারের চাচাতো ভাই শুভ কারুশ্রীর শাটার খুলে দেখেন ভেতরে সবকিছু এলোমেলো। সিন্দুকের তালা ভাঙা, ভেতরে স্বর্ণালংকার চুরির হয়েছে। কারুশ্রী ও আফিয়া জুয়েলার্সের মাঝের ইটের দেয়ালের একটি অংশ কাটা। এ খবর পেয়ে তূর্য জুয়েলার্সে ছুটে এসে আফিয়া জুয়েলার্সের মালিক খন্দকার আরিফুর রহমানকে ফোন করেন।
তিনি এসে দেখেন, তাঁর দোকানের শাটারে লাগানো তালা অক্ষত। চাবি দিয়ে তালা খোলার পর মাঝের দেয়াল কাটা দেখেন তিনিও। কিন্তু তাঁর দোকানের সিন্দুক অক্ষত। সিন্দুকে দেড় লাখ টাকা মূল্যের অলংকার অক্ষত। অর্থাৎ আফিয়া জুয়েলার্সের কোনো কিছুই চুরি হয়নি।
আফিয়া জুয়েলার্সের মালিক খন্দকার আরিফুর রহমান বলছেন, ‘আমার দোকান দিয়ে চোর ঢুকলে শাটারের তালা ভাঙা থাকত। চুরির ঘটনা জানাজানির পর এলাম। চাবি দিলাম, তালা খুলে গেল। আমার দোকানের শাটারের তালা যেমন অক্ষত, তেমনি কারুশ্রীর শাটার ও তালা অক্ষত। এমনও তো হতে পারে কারুশ্রীতে চুরির পর চোর দেয়াল কেটে আমার দোকানে ঢুকেছিল। সিন্দুক ভাঙার সময় হয়তো পায়নি। আমি আল্লাহকে বলেছি, ইনশা আল্লাহ রহস্য উন্মোচন হয়ে যাবে। আপনারা সবই দেখতে পাবেন।’
এদিকে দূর্ধর্ষ এই চুরির প্রতিবাদে স্বর্ণপট্টির সবগুলো জুয়েলার্সের দোকান তিনদিন ধরে বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। শনিবার তাঁরা বিক্ষোভ মিছিলও করেছেন। কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক তূর্য সরকার এখনো প্রায় বাকরুদ্ধ।
তূর্যের সহোদর ইমন সরকার বলেন, ‘আমাদের সব মালামাল দোকানেই থাকত। কোনো কিছুই আমরা বাড়িতে নিয়ে যেতাম না। চোর চুরি করে সিসিটিভি ক্যামেরার ডিভিআরও নিয়ে গেছে।’ সরাসরি নাম না বললেও ইমনের কথাবার্তায় বোঝা যায়, তিনি পাশের দোকান আফিয়া জুয়েলার্সের মালিক-কর্মচারীদের সন্দেহ করছেন।
তিনি বলেন, ‘তিনদিন পার হয়ে গেছে। আমরা প্রশাসন থেকে কোনো আশ্বাসও পেলাম না। কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও পুলিশ ধরল না।’ এই চুরির ঘটনায় শনিবার রাতে তূর্য সরকার অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলা করেছেন।
মামলার তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ রবিউল ইসলাম বলেন, পুলিশের পাশাপাশি সরকারের কয়েকটি সংস্থা একসঙ্গে কাজ করেছে। তারা কিছু তথ্য পেয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এখনো সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেপ্তার ও চুরির মালামাল উদ্ধার হয়নি। হলেই গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) রাজশাহী জেলার সভাপতি আশরাফুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং চুরি হওয়া অলংকার উদ্ধারে তারা ২৪ ঘণ্টার সময় দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনদিন পার হয়ে গেছে। তবে পুলিশ কমিশনার আশ্বাস দিয়েছেন, অল্প সময়ের মধ্যে কাজ হয়ে যাবে। বিষয়টি তাঁরা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। র্যাবসহ অন্য সংস্থাগুলোকেও বলে দিয়েছেন।



