দেশে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে সরকারের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই’। আমাদের দেশে এরকম কোনো তৎপরতা নেই। কিছু এক্সট্রিমিস্ট (উগ্রবাদী) গ্রুপ পৃথিবীর সব দেশেই অ্যাকটিভ থাকে। রেডিক্যাল কিছু ফোর্স থাকে, মৌলবাদী কিছু পার্টি থাকে। এগুলোতে আমরা ইউজড টু। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডাঃ জাহিদুর রহমান বলেছেন, ‘দেশে জঙ্গি তৎপরতা আছে’। তবে সরকার তা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, দেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে সরকারের মধ্যে এতো লুকোচুরি কেন?
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে চলতি জুলাই মাসে ছয়জনকে গ্রেফতার (এদের মধ্যে একজন এনসিপির নেতা), সিঙ্গাপুর ফেরত দুজনকে উগ্রবাদী তৎপরতার কারণে গ্রেফতারের ঘটনা এবং গত ডিসেম্বরে ঢাকার কেরানীগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা প্রমাণ করে দেশে জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদী পন্থা সক্রিয় আছে। এছাড়া কয়েকদিন আগে জঙ্গি হামলার আশংকার কারণে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করেছিল। যার ফলে দেশের প্রধান বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুখে অস্বীকার করলেও সরকারের কার্যক্রম প্রমান করে, সরকার জঙ্গি আতঙ্কে আছে।
বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম নতুন নয়,গত শতকের আশির দশকে জঙ্গিবাদ শুরু হয়েছে।সেসময় উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আফগান যুদ্ধে সোভিয়েত দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি অংশগ্রহণ করে। সেখানে তারা প্রশিক্ষণ নেয়, এবং যুদ্ধ শেষে তাদের অত্যন্ত আড়াই হাজার দেশে ফিরে আসে। এরাই তৈরি করে হরকাতুল জিহাদের মতো জঙ্গি সংগঠন। এছাড়া তারা আরো নানা ব্যানারে জিহাদি সংগঠন গড়ে তোলে।
এদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে দেশজুড়ে ব্যাপক হারে কওমি মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। এই কওমি মাদ্রাসাগুলোকে ঘিরে একটা উগ্রপন্থি গ্রুপ তৈরি হয়। তারাই গত কয়েক দশক ধরে দেশজুড়ে নাশকতামূলক কর্মকান্ড চালিয়ে এসেছে। যদিও এখন আর উগ্রপন্থা গ্রুপের কার্যক্রম শুধুমাত্র মাদ্রাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। স্কুল-কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়সহ ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতেও উগ্রপন্থা ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে।
দেশে নামে-বেনামে ২৫ টির বেশি জঙ্গি সংগঠন আছে। এছাড়া দেশের বাইরে থেকে লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) ও তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।ইতিমধ্যে বাংলাদেশে বেশ কিছু সংগঠনকে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), আল্লাহর দলসহ শাহাদাত-ই-আল হিকমা,হরকাতুল জিহাদ (হুজি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি) ও হিযবুত তাহরি উল্লেখযোগ্য। তবে এসব সংগঠন কাগজ কলমে নিষিদ্ধ হলেও তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ নেই।
বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় তো দেশ জঙ্গিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। সেসময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, একই বছরের ২১ মে বাঙালি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ রাষ্টদূত আনোয়ার চৌধুরীর উপর বোমা হামলা করা হয়। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জেএমবির ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে জঙ্গিবাদের সর্ববৃহৎ কার্যক্রম দৃশ্যমান হয় । ২০০৫ সালে ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠি আদালতে বোমা হামলা করে দুইজন বিচারককে হত্যা করা হয়।
এছাড়া ওই সময় ছোট-বড় অসংখ্য জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। অনেক মানুষ নিহত আহত হয়েছেন। আর পুরো উত্তরবঙ্গ তো কার্যত জঙ্গিদের দখলেই চলে গিয়েছিল। তখনও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল,দেশে কোনো জঙ্গি নেই। সব মিডিয়ার সৃষ্টি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গিরা কৌশল পরিবর্তন করে কিছুটা আত্মগোপনে চলে যায়। তবে ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ ও নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ৫ জঙ্গিসহ দেশি-বিদেশি ২৯ জনের প্রাণহানি ঘটে।সেসময় জঙ্গি হামলার ঘটনা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।তারপর সরকারের জোড়ালো পদক্ষেপে জঙ্গিরা আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি।কিন্তু তারা দমে যায়নি কৌশল পরিবর্তন করে একদল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
আরেক দল ভিন্ন কৌশলে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।ডিজিটাল মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক, টুইটার, টেলিগ্রাম, উইকার এবং অন্যান্য নিরাপদ অ্যাপস ব্যবহার করে লেখা, বক্তব্য আদান-প্রদান করে ধর্ম ও জিহাদ বিষয়ে অপপ্রচার চালিয়ে গেছে। মিথ্যা উদ্ভট তথ্য দিয়ে তারা দিনের পর দিন মানুষকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে কর্মী সংগ্রহ করে গেছে।এদের বড় টার্গেট ছিল অল্প বয়সী তরুণ-তরুণী যাদের ধর্ম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই।
এখনও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশের সর্বত্র তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।এর সুফলও পেয়েছে তারা। বিগত সরকার পতন আন্দোলনে এরাই মাঠে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িত ছিল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জঙ্গিরা একদম খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল। তখন জঙ্গিরা সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করেছে। স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেছে। অনেক জায়গায় মুক্ত পরিবেশে তাদের দলীয় কর্মসূচি, বিক্ষোভ সমাবেশ পালন করতে দেখা গেছে। সেখানে তারা তাদের কালেমাখচিত পতাকা ব্যবহার করে নিজেদের পরিচয়ও প্রকাশ করেছে। সেসময় তারা সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধ ও শিল্প-সংস্কৃতির সকল ভাস্কর্যগুলো গুড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে সরকারের পতনের পর জঙ্গিবাদের বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত শত-শত ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। জামিনপ্রাপ্ত জঙ্গিদের মধ্যে সন্দেহভাজন, বিচারাধীন, সাজাপ্রাপ্ত, এমন কি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও ছিলেন।
এছাড়া নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন জেল ভেঙে জঙ্গিরা বের হয়ে গিয়েছিল, তাদের অনেকেরই আর হদিস পাওয়া যায়নি। জেল ভেঙে পালানো জঙ্গিদের সম্পর্কে তখন পুলিশ বলেছিল, ‘বিগত সরকারের সময় গ্রেফতারকৃতদের অনেকেই জঙ্গি ছিল,আবার অনেককেই ট্যাগ দিয়ে জেলে আটকে রাখা হয়েছিল। দুই ধরনেরই ছিল।
পুলিশের তথ্য মতে, অভ্যুত্থানের সময়ে সারা দেশের কারাগার থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ বন্দি পালিয়ে গিয়েছিল। পালিয়ে যাওয়া ১৫০০ বন্দি ফিরে আসলেও প্রায় ৭০০ জন বন্দি ফিরে আসেনি। যার মধ্যে ৭০ জন অতি ঝুঁকিপূর্ণ, যেমন: জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। এছাড়া ৫ হাজার ৭৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৩৩১ টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের কথা বলা হলেও ১ হাজার ৪১৯টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এবং লুট হওয়া ৬ লক্ষ ৫১ হাজার ৬০৯টি বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদের মধ্যে ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৪৫৬ টি গোলাবারুদ উদ্ধার হলেও এখনো ২ লাখ ৬৩ হাজার ১৫৩ টি গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি।
জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনা,আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমা সংগ্রহে অনেক টাকার দরকার হয়। এছাড়া বছরব্যাপী দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা, নতুন নতুন সদস্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণে যে প্রচুর ব্যয় হয়, এই টাকা আসলে কে দেয়? এসব নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এটা তো পরিস্কার, নব্বই দশক থেকে পাকিস্তান, তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মুসলিম দেশ থেকে বিভিন্ন পথে এই দেশে জঙ্গিবাদের জন্য অর্থ এসেছে।
বিশেষ করে বেসরকারি সাহায্য সংস্থার (এনজিও) ব্যানারে বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি অর্থায়ন হয়েছে। সরকারি তথ্য মতে, জঙ্গি অর্থায়নে জড়িত বলে অভিযুক্ত বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্যেভিত্তিক। এছাড়া জামায়াত নেতাদের পরিচালিত বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও বিদেশ থেকে প্রচুর অর্থ আসে।
জঙ্গিবাদ বিস্তারের জন্য যে কারণগুলোর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, তার প্রায় প্রত্যেকটি বিষয় বাংলাদেশে আছে। ধর্মীয় অপব্যাখ্যা, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর তৎপরতা সবই বাংলাদেশে বিদ্যমান। এসবের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত জঙ্গিবাদ নির্মূল হবে না। বরং দিনদিন বেড়েই যাবে।
জঙ্গিবাদ নিয়ে কোনো লুকোচুরি নয়। বরং কারণ গুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নইলে বাংলাদেশ অনেক বড় বিপদে পড়বে।যা কারোই কাম্য নয়।



