জামায়াত নিষিদ্ধের তিন দিনের মাথায় রান্না ভাত ফেলে পালাতে বাধ্য হয়েছিল সরকার: জামায়াতের আমির

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং জামায়াতের জন্য বেদনাদায়ক দিন। ১ আগস্ট জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেও মাত্র তিন দিনের মাথায় গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জামায়াতের আমির বলেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার পর দলের নেতা-কর্মী ও দেশের মানুষের প্রতি আন্দোলনরত জনগণের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তার দাবি, জনগণ সেই আহ্বানে ব্যাপক সাড়া দিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তৎকালীন সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়।

তিনি বলেন, তৎকালীন সরকার মনে করেছিল দমন-পীড়ন, নির্যাতন ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলন দমন করা সম্ভব হবে। কিন্তু জনগণের প্রতিরোধের কারণে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে জনগণের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে কোনো সরকার টিকে থাকতে পারে না। অন্যায় ও অবিচারের পরিণতি একসময় ভোগ করতেই হয়।

বিএনপি কর্মসংস্থানের কথা বলে এখন টেম্পু স্ট্যান্ডে চাকরি দিচ্ছে

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থানের কথা বললেও এখন টেম্পু স্ট্যান্ডে চাকরি দিচ্ছে। জনগণ চাঁদাবাজির এই চাকরি চায় না।

বিএনপির মহাসচিবের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে দুর্নীতি বন্ধ করা যায়নি; বরং দুর্নীতি বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নৈতিকভাবে দেশ পরিচালনার সক্ষমতা হারিয়েছে সরকার।

তিনি বলেন, কোনো আধিপত্যের কাছে মাথানত করা হবে না। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনা হবে। জনগণের ভোটের রায় নিয়ে কোনো ‘ছিনিমিনি খেলা’ মেনে নেওয়া হবে না।

একই অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, চাঁদাবাজিমুক্ত সরকার প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব নয়।

ছাত্রদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না

‘আওয়েকেন ইয়োরসেলফ: হারমোনাইজিং স্পিরিচুয়ালিটি উইথ স্কিলস টু লিড দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ১৪তম ইয়ুথ সামিট-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ঢাকা কলেজের শহীদ আ ন ম নজীবউদ্দিন খান খুররম অডিটোরিয়ামে দিনব্যাপী এ সামিট অনুষ্ঠিত হয়। এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া সারা দেশের দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগের নির্বাচিত মেধাবী শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়।

সকালে পবিত্র দারসুল কোরআনের মাধ্যমে সামিটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। অনুষ্ঠানে সূরা কাহফের ৪৭ থেকে ৪৯ নম্বর আয়াতের ওপর জ্ঞানগর্ভ দারস পেশ করেন বিশিষ্ট ইসলামি স্কলার মাওলানা ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার। পরে স্বাগত ও উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে তরুণদের শুধু একাডেমিক শিক্ষায় সেরা হলেই হবে না; তাদের আধ্যাত্মিক শক্তি ও আধুনিক দক্ষতাতেও বলীয়ান হতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে হলে সবার আগে নিজেদের পরিশুদ্ধ করতে হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, নীতিহীন মেধাবীরাই সমাজের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। তাই দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করতে হলে সবার আগে ‘শরীরের ভেতরের ভূত’ তাড়াতে হবে।

শহীদ আবু সাঈদের বীরত্বের কথা স্মরণ করে জামায়াতের আমির বলেন, বুক পেতে দিয়ে ছাত্ররা যে স্বাধীনতা ও অধিকার আদায় করেছে, তা কোনোভাবেই বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। শহীদদের রক্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন দেশ গড়ে তুলতে হবে।

কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে আজকের তরুণরাই নেতৃত্ব দেবে। এজন্য শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় শতভাগ মনোযোগী হতে হবে।

তিনি পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে তরুণদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এগুলোকে সময় নষ্ট বা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণে নয়, বরং জ্ঞান অর্জন ও চরিত্র গঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন।

দৃষ্টি হারানো কিশোর আলিফের পাশে ডা. শফিকুর

এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি শেষে হবিগঞ্জে ছাত্রদলের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানো কিশোর আলিফ চৌধুরীকে দেখতে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যান ডা. শফিকুর রহমান।

হাসপাতালে আলিফের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন তিনি। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে তার চিকিৎসার অগ্রগতির বিষয়েও অবহিত হন। এ সময় আলিফ ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করে দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া করেন জামায়াতের আমির।

হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি হবিগঞ্জে জুলাই পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলার ঘটনায় আবারও তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এ ধরনের নৃশংস হামলার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশেও এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা অত্যন্ত হতাশাজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, আমরা দেখতে চাই সরকার এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত, তারা যে দলেরই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে সমভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে।

অভিযোগ করে তিনি বলেন, হামলার শিকার ব্যক্তিরা বিচার চাইতে গিয়ে মামলা করতেও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেক চেষ্টা ও তদবিরের পর মামলা নেওয়া হয়েছে। সরকারের দায়িত্ব আইনের শাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু ভুক্তভোগীদের যদি ন্যায়বিচার পেতেই সংগ্রাম করতে হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কীভাবে তৈরি হবে—প্রশ্ন রাখেন তিনি।

এ সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, শেরেবাংলা নগর উত্তর থানা আমির আব্দুল আওয়াল আজম, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) নেতা ডা. হাসান আল বান্না, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন এবং যুগ্ম সদস্যসচিব এস এম সাইফ মোস্তাফিজসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments