দুই বছর পরও শহীদ পরিবারে ক্ষোভ, আছে হতাশা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও অনেক শহীদ পরিবারের অভিযোগ রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কিছু কিছু বিষয় বাস্তবায়িত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের এমআইএস তথ্য অনুযায়ি জুলাই-আগষ্ট আন্দোলনে সারাদেশে সরকারি গেজেটে শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ জন। এসব শহীদ পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে উঠে এসেছে হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার চিত্র।

জুলাইয়ের প্রথম শহীদ রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল দ্রুত বিচার। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতির। তিনি বলেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে জীবন দিলেও এখনো সেই বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে ওঠেনি। চাঁদাবাজি, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা এখনো রয়ে গেছে।

রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে ১৮ জুলাই গুলিতে প্রাণ হারান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল(বিইউপি) এমবিএ’র শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। জুলাই-আগষ্ট আন্দোলনে মুগ্ধের শহীদ হওয়ার ঘটনা আন্দোলন আরো ছড়িয়ে পড়ে। ‘পানি লাগবে পানি’-এই শ্লোগান মুখে মুখে।

গতকাল মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, শহীদ মুগ্ধের রক্ত ছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার যেখানে থাকবে না কোনো দলাদলি, থাকবে না চাঁদাবাজি, থাকবে না দখলবাজি। অন্যায় ও অত্যাচার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার। সেই লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করেছে। বর্তমান বিএনপি সরকারও জুলাই-আগষ্ট আন্দোলনের স্প্রিরিট নিয়ে কাজ করছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিচার বাস্তবায়ন না হলে শহীদদের রক্তের দাম বৃথা যাবে।

ঢাকায় ধানমন্ডির ৩ নম্বর রোডে সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আছাদুজ্জামান খান কামালের সরকারি ভবনের সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ গুলি করলে সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয় নিহত হয়। গতকাল তাহির জামান প্রিয়র বাবা আবু হেনা মোস্তফা জামান বলেন, ‘আমি একজন একমাত্র সন্তানহারা বিপত্নীক বাবা। ৫ বছর বয়স থেকে প্রিয়কে কোলে পিঠে একাই মানুষ করেছি। জুলাই আন্দোলনে সন্তান শহীদ হওয়ায় এই বৃদ্ধ বয়সে আমাকে দেখার কেউ রইল না।

সরকার থেকে কোনো সহযোগিতা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে আবু হেনা মোস্তফা জামান বলেন, ছেলে হারিয়ে আমি মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। এরমধ্যে প্রিয় মা কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করে সকল সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন। পরে আমার আবেদনের প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয় আমাকে ১ লাখ টাকা এককালীন ও মাসিক ৫ হাজার টাকা ভাতা দেয়। এই ৫ হাজার টাকায় আমি এখন রংপুরের বাসায় দিনযাপন করছি।

গুলিতে নিহত প্রথম নারী শহীদ নাঈমা সুলতানার বাবা-মাও বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার ভিডিও ও বিভিন্ন আলামত থাকার পরও বিচার দৃশ্যমান হয়নি। সরকার ঘোষিত আর্থিক সহায়তার কিছু অংশের প্রক্রিয়াও দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে আছে।

শাহবাগে গুলিতে নিহত শিক্ষার্থী গোলাম নাফিজের বাবা গোলাম রহমান বলেন, তার ছেলে এমন বাংলাদেশের জন্য জীবন দেয়নি যেখানে এখনো মানুষ খুন হবে, চাঁদাবাজি চলবে। তিনি আশা করেছিলেন, আন্দোলনের পর একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

হবিগঞ্জে নিহত সাংবাদিক সোহেল আখুঞ্জির স্ত্রী মৌসুমী আক্তার বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তিন সন্তান নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে। হত্যাকাণ্ডের বিচার এগোয়নি, নিরাপত্তাহীনতাও কাটেনি। তিনি বলেন, যে বাংলাদেশের জন্য আমার স্বামী জীবন দিয়েছেন, সেই বাংলাদেশ এখনো পাইনি।

১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে কর্তব্যরত অবস্থায় ঢাকা টাইমসের সাংবাদিক মেহেদি হাসান নিহত হয়। গতকাল তার ভাই জাহিদ হাসান আশিক বলেন, মেহেদির দুই শিশু সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আমরা শঙ্কিত। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয় ও জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে মেহেদীর পরিবার কোনো আর্থিক সহায়তা পায়নি।

শনির আখড়ায় নিহত ইউসুফ সানোয়ারের বোন বিউটি বেগম অভিযোগ করেন, শুরুতে অনেকে পাশে থাকলেও এখন তাদের খোঁজ নেন না। বিচার হবে কি না, তা নিয়েও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।

শহীদ পরিবারের অনেকের অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয় ও জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে শহীদদের জন্য আর্থিক সুযোগ সুবিধার বাস্তবায়নের গতি ধীর। অনেক পরিবার এখনো পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন, স্থায়ি কর্মসংস্থান কিংবা নিয়মিত সহায়তা পায়নি। তাদের দাবি, শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে জরুরি।

গোলাপগঞ্জে ৭ শহীদের পরিবারের ক্ষোভ ও আইনি জটিলতা
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘এক দফা’ অসহযোগ কর্মসূচির দিনে সিলেটের গোলাপগঞ্জ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেদিনের এই পৈশাচিক হামলায় শহীদ হন, নাজমুল ইসলাম (নিশ্চিন্ত এলাকা), সানি আহমদ (শিলঘাট গ্রাম), তাজউদ্দীন (বারোকোট গ্রাম), মিনহাজ উদ্দিন (দত্তরাইল গ্রাম), গৌছ উদ্দীন (ঘোষণা গ্রাম), জয় আহমদ (রায়গড় গ্রাম), কামরুল ইসলাম পাভেল (কানিশাইল গ্রাম; যিনি ৫ আগস্ট ক্বিন ব্রিজ এলাকায় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে পরদিন মারা যান)।

ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার না পাওয়ার বিষয়ে শহীদ কামরুল ইসলাম পাভেলের বাবা রফিক উদ্দিন জানান, তার ছেলে পবিত্র কুরআনের হাফেজ ও অত্যন্ত নিরহ ছিল। তিনি মামলা করলেও এখনো কোনো বিচার দেখতে পাননি এবং অনেক আসামি ইতোমধ্যে বিদেশে পালিয়ে গেছে।

শহীদ নাজমুল ইসলামের ভাই ছামিদ আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পরিবারের অমতে তার ভাবিকে দিয়ে প্রায় ৩০০ জনকে আসামি করে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যা মামলা করানো হয়েছে। তিনি প্রকৃত হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

বগুড়ায় শহীদ রাতুলের পরিবারের অনিশ্চিত জীবন
একই চিত্র বগুড়ায়। জুলাই বিপ্লবে পুলিশের গুলিতে নিহত বগুড়ার সুলতানগঞ্জ পাড়ার উপশহর পথ পাবলিক স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী এবং মুদি দোকানি জিয়াউর রহমান ও রোকেয়া বেগমের ছোট ছেলে শহীদ জুনাইদ ইসলাম রাতুল (১৩) এর পরিবারও দিন কাটাচ্ছে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তায়।
৫ আগস্ট বগুড়া সদর থানার সামনে মিছিলে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘ ৪৬ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন রাতুল।

শহীদ রাতুলের বাবা জিয়াউর রহমান জানান, সন্তান হারানোর পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সরকারিভাবে কিছু সহায়তা বা আশ্বাস মিললেও তা স্থায়ী কোনো সুরাহা দেয়নি। প্রধানন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং জেলা প্রশাসক আর্থিক সহায়তা দিলেও হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার এখনও পাননি তারা।

জুলাই শহীদ পরিবার সোসাইটির রাজশাহী বিভাগীয় সভাপতি উজ্জ্বল হোসেন জুবায়েল জানান, আন্দোলনের সময় নিহত ও আহতদের পরিবারগুলো শুরুতে কিছু সহানুভূতি পেলেও সময়ের সঙ্গে তা কমতে শুরু করে। বর্তমানে অনেক পরিবারই আর্থিক সংকট, মানসিক চাপ ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
সুশাসনের জন্য প্রশাসনের (সুপ্র) সাধারণ সম্পাদক কেজিএম ফারুক জুলাই শহীদদের দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।

অন্যদিকে, নগর বিএনপির সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী হিরু জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যাপারে সম্পূর্ণ তৎপর রয়েছে।

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ পরিবারের একটাই প্রশ্ন—রক্তাক্ত সেই দিনের প্রকৃত দায়ীদের বিচার কবে হবে? সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও সম্মানজনক জীবনযাপন এখন সময়ের দাবি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments