চিকিৎসক স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু: স্বামীর বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলা

রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসে শমরিতা মেডিকেল কলেজের এনাটমি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শামীমা পারভীন লস্করের রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারের অভিযোগ, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী আরিফ হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আরিফ হোসেন দাবি করেছেন, তার স্ত্রী মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে মারা গেছেন।

নিহত ডা. শামীমা পারভীন লস্কর ছিলেন শমরিতা মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিকেল জার্নাল এডিটরস এর জেনারেল সেক্রেটারি। তিনি রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার ২ নম্বর অ্যাভিনিউয়ের ১০ নম্বর সড়কের ৬৩২ নম্বর বাসায় স্বামী আরিফ হোসেনের সঙ্গে বসবাস করতেন।

রাতের ফোনে মৃত্যুর খবরঃ
মামলার অভিযোগ ও স্বজনদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ৯ জুলাই রাত ১২টার দিকে ডা. শামীমার বড় বোন কানিজ ফাতেমাকে ফোন করেন আরিফ হোসেন। তিনি জানান, শামীমা বেডরুমে মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে গেছেন এবং তাকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।
এর ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর আবার ফোন করে আরিফ হোসেন পরিবারের সদস্যদের জানান, শামীমা মারা গেছেন এবং তাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে।

খবর পেয়ে নিহতের বড় বোন কানিজ ফাতেমা, তার সন্তানসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা মিরপুর ডিওএইচএসের ওই ফ্ল্যাটে ছুটে যান। তাদের অভিযোগ, সেখানে গিয়ে তারা আরিফ হোসেন ছাড়া আর কাউকে দেখতে পাননি।
কানিজ ফাতেমার ভাষ্য, বাসায় ঢুকে তিনি দেখেন তার বোনের মরদেহ বেডরুমের খাটে শোয়ানো অবস্থায় রয়েছে। গলা পর্যন্ত কাপড় দিয়ে মরদেহ ঢাকা ছিল।
আরিফ হোসেন তখন তাদের জানান, শামিমা মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। তাকে কিংস হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে তিনি নিজেই গাড়িতে করে মরদেহ বাসায় নিয়ে আসেন।

মরদেহ গোসলের সময় শরীরে আঘাতের চিহ্নঃ
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, রাত আনুমানিক ২টার দিকে মরদেহ গোসল করানোর জন্য গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ডা. শামিমা নারী হওয়ায় গোসল ও কাফনের কাজ করছিলেন নারী স্বজনরা। এ সময় একজন নারী স্বজন মরদেহের পিঠ, হাত ও পায়ে লালচে দাগ দেখতে পান। পিঠের দুই স্থানে রক্ত জমাটের মতো চিহ্নও দেখতে পান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই স্বজন তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল ফোনে আঘাতের চিহ্নের ছবি ধারণ করেন।

বিষয়টি পরিবারের অন্য সদস্যদের জানানো হলে তারা মরদেহের ময়নাতদন্তের দাবি জানান।
তবে পরিবারের অভিযোগ, আরিফ হোসেন তার স্ত্রীর মৃত্যু স্বাভাবিক হয়েছে দাবি করে ময়নাতদন্তে আগ্রহ দেখাননি। পরদিন ১০ জুলাই সকালে বনানী কবরস্থানে ডা. শামীমা পারভীন লস্করের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়।

মৃত্যুসনদ ছাড়াই দাফন ঃ
মামলার বাদী কানিজ ফাতেমার অভিযোগ, দাফনের আগে পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুসনদ দেখতে চাইলে আরিফ হোসেন বিষয়টি এড়িয়ে যান। তার অভিযোগ, ঘটনার পর দ্রুত দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

আদালতে মামলা দায়ের ঃ
ঘটনার পর কানিজ ফাতেমা মামলা করতে পল্লবী থানায় যান। তার দাবি, পুলিশ তাকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেয়। এরপর গত ২৮ জুলাই ঢাকার সিএমএম আদালতে আরিফ হোসেনকে আসামি করে ডা. শামীমা পারভীন লস্করকে হত্যার অভিযোগে মামলা করেন কানিজ ফাতেমা। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্ত করে নিয়মিত মামলা হিসেবে গ্রহণের জন্য পল্লবী থানাকে নির্দেশ দেন। পরে গত ১ আগস্ট আদালতের নির্দেশে পল্লবী থানা মামলাটি নথিভুক্ত করে তদন্ত শুরু করে।

মামলায় যেসব অভিযোগ আনা হয়েছেঃ
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ডা. শামীমা পারভীন ও তার স্বামী আরিফ হোসেনের মধ্যে পারিবারিক বিষয় নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হতো। তাদের বাসার গৃহকর্মী বিভিন্ন সময়ে এসব বিরোধ প্রত্যক্ষ করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বাদীর অভিযোগ, ঘটনার দিন রাতে বাসায় অবস্থানকালে আরিফ হোসেনের সঙ্গে শামীমার তর্ক হয়। একপর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, শামীমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয় এবং মাথায় আঘাতের কারণে তিনি মেঝেতে পড়ে যান। পরে তাকে বালিশ চাপা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলার বাদী আরও অভিযোগ করেছেন, আরিফ হোসেনের কোনো নিজস্ব সম্পত্তি না থাকায় তিনি ডা. শামীমার সম্পত্তির প্রতি লোভী ছিলেন। এ ছাড়া বৈবাহিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কারণে এ ঘটনা ঘটতে পারে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বামীর দাবি, সব অভিযোগ মিথ্যাঃ
অভিযোগের বিষয়ে আরিফ হোসেন দাবি করেছেন, তার স্ত্রী দীর্ঘদিনের পরিচিত চিকিৎসক ছিলেন এবং তার মৃত্যু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তিনি বলেন, শামীমা হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যান। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে তিনি নিয়ম অনুযায়ী মরদেহ বাসায় নিয়ে আসেন। তিনি হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে যেসব বিষয়ঃ
ডা. শামিমা পারভীন লস্করের মৃত্যুর ঘটনায় এখন কয়েকটি বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। পল্লবী থানার ওসি হাসান বশির বলেন, যেহেতু বিনা ময়নাতদন্তে লাশ দাফন করা হয়েছে, তাই এই মামলা তদন্তের জন্য আমরা লাশ পুনঃউত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করার আবেদন করা হবে আদালতে। এছাড়া মৃতদেহের ছবিগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করা হবে।

উল্লেখ্য, ডা. শামিমা পারভীন লস্কর ও আরিফ হোসেন উভয়ের এটি দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। ২০০০ সালে তাদের মধ্যে বিয়ে হয়। তারা নিঃসন্তান হলেও শামিমার আগের সংসারের পুত্র সন্তান ২৪ বছর বয়সে দুরারোগ্য ব্যাধিতে মারা যান।

অধ্যাপক ডা. শামীমা পারভীন লস্কর ছিলেন একজন খ্যাতিমান অ্যানাটমি বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসা শিক্ষক, গবেষক, বায়োএথিক্সবিদ ও সংগঠক। চিকিৎসা শিক্ষায় তাঁর অবদান দেশের অসংখ্য চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীর কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের শুরুতে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে অ্যানাটমি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি মেডিকেল কলেজে অ্যানাটমি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এমএইচ সমরিতা মেডিকেল কলেজ, শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ এবং মুন্নু মেডিকেল কলেজে তিনি শিক্ষা ও বিভাগীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

প্রায় ৩৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও পেশাগত নৈতিকতার ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন।

চিকিৎসা শিক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশে বায়োএথিক্সকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে অধ্যাপক ডা. শামীমা পারভীন লস্করের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত Bangladesh Bioethics Society (BBS)-এর প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্বে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে দীর্ঘদিন তিনি বায়োএথিক্স শিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে কাজ করেন।

তিনি Bangladesh Journal of Bioethics-এর Executive Editor ও Editor-in-Chief হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জার্নালটির মানোন্নয়ন, গবেষণা প্রকাশনার নৈতিক মান বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি বৃদ্ধিতে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া তিনি National Research Ethics Committee-এর সদস্য হিসেবে দেশের biomedical ও social science research-এর নৈতিক মানদণ্ড উন্নয়নে কাজ করেন।

অধ্যাপক ডা. শামীমা পারভীন লস্করের কর্মপরিধি শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্তর্জাতিক বায়োএথিক্স অঙ্গনেও তিনি নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

তিনি Asian Bioethics Association (ABA)-এর সভাপতি হিসেবে মে ২০২৩ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর সময় তিনি সংগঠনটির Immediate Past President ছিলেন। এর আগে তিনি ABA-এর Vice President for South Asia হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ও publication ethics-এর ক্ষেত্রেও তাঁর আন্তর্জাতিক অবদান রয়েছে। তিনি World Association of Medical Editors (WAME)-এর Director (২০১৩–২০১৫) ও Treasurer (২০১৭–২০২০) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এ ছাড়া Asia Pacific Association of Medical Editors (APAME)-এর Ethics and Editorial Policy Committee-এর Co-Chair এবং Bangladesh Association of Scholarly Scientific Journal Editors-এর Vice President হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি UNESCO ও FAO-এর বায়োএথিক্স বিষয়ক পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন।

অধ্যাপক ডা. শামীমা পারভীন লস্কর American University of Sovereign Nations (AUSN)-এর প্রতিষ্ঠাকালীন Board of Governors-এর সদস্য ছিলেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর Clinical Professor of Anatomy, Dentistry and Bioethics হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের শিক্ষা ও গবেষণায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

অধ্যাপক ডা. শামীমা পারভীন লস্কর ছিলেন একাধারে চিকিৎসা শিক্ষক, গবেষক, সম্পাদক, সংগঠক এবং বাংলাদেশের বায়োএথিক্স আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্থপতি।

বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির অ্যানাটমি শিক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে বিভাগীয় নেতৃত্ব, গবেষণার নৈতিকতা, বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও বায়োএথিক্সকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

তাঁর কর্ম, আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধ বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার আগামী প্রজন্মের জন্য দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments