কলকাতায় আগুনে পরিবারসহ কুষ্টিয়ার সাংবাদিকের মর্মান্তিক মৃত্যু

ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কুষ্টিয়ার সাংবাদিকসহ একই পরিবারের চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৮), তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমিন (২৭), সাড়ে তিন বছর বয়সী মেয়ে স্বর্ণশিখা দত্ত এবং তার শ্বশুর আকরাম আলী (৭০)। এ ঘটনায় মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির বরাতেও এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে নিউ মার্কেটসংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন ও ঘন ধোঁয়ায় হোটেলের কক্ষে আটকা পড়ে দেবাশীষ দত্তসহ চার বাংলাদেশি মারা যান। খবর পেয়ে দমকল বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান চালান। অচেতন অবস্থায় নয়জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন।

জানা গেছে, ঢাকায় প্রকাশিত আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া প্রতিনিধি দেবাশীষ দত্ত গত ৩ আগস্ট স্ত্রী, শিশুকন্যা ও শ্বশুরকে সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতের বেঙ্গালুরু যান। সেখানে চিকিৎসা শেষে ১৭ আগস্ট দুপুরে তাঁরা কলকাতায় পৌঁছান। দেশে ফেরার আগে কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় কেনাকাটা শেষে তাঁরা ওই আবাসিক হোটেলে ওঠেন।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কলকাতায় কেনাকাটা শেষে রাতে তাঁরা হোটেলে ঘুমিয়ে পড়েন। গভীর রাতে আকস্মিকভাবে হোটেলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের তীব্রতা ও ধোঁয়ায় কক্ষগুলো ভরে গেলে বের হতে না পেরে তাঁরা আটকা পড়েন।

নিহত দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়া পৌর এলাকার আড়ুয়াপাড়ায় স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতেন। তার শ্বশুর আকরাম আলী ছিলেন শহরের থানাপাড়ার বাসিন্দা। দেবাশীষ আজকের পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন।

এদিকে একসঙ্গে পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কুষ্টিয়ায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহত দেবাশীষের মা স্বর্ণলতা দত্ত, বাবা দিলীপ দত্ত এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। নিহত আকরাম আলীর স্ত্রী আফরোজা পারভীনের আহাজারিতে স্বজনদের মধ্যে শোকের মাতম চলছে। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।

নিহত আকরাম আলীর স্ত্রী আফরোজা পারভীন জানান, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে জামাই দেবাশীষ তার স্ত্রী, মেয়েশিশু ও শ্বশুরকে সঙ্গে নিয়ে বেঙ্গালুরু গিয়েছিলেন। চিকিৎসা শেষে ফেরার পথে কলকাতার নিউ মার্কেটে কেনাকাটা করে তারা হোটেলে ওঠেন। পরদিন ভোরে কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে তাদের রওনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সব শেষ হয়ে গেল।

তিনি জানান, বুধবার সকাল ১১টার দিকে বারবার আকরাম আলীকে ফোন করেও কোনো সাড়া পাচ্ছিলেন না। পরে কয়েকবার ফোন করার পর কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের একজন কর্মকর্তা ফোনটি ধরেন। এরপর ওই কর্মকর্তা হোয়াটসঅ্যাপে নিহতদের ছবি পাঠান। ছবি দেখে পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত হন, অগ্নিকাণ্ডে নিহত চারজনই তাদের স্বজন।

এদিকে সাত বছর বয়সী ছোট মেয়ে মাহিমাকে বাড়িতে রেখে যাওয়ায় প্রাণে বেচে গেছে শিশুটি। স্থানীয় এডুকেয়ার স্কুলের কেজি শ্রেণির ছাত্রী মাহিমাকে দাদা-দাদির কাছে রেখে বাবা-মা ও বড় বোন ভারতে গিয়েছিলেন। বাবা-মা ও বোনের মৃত্যুর খবর জানার পরও পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারছে না শিশুটি। সে স্বাভাবিকভাবেই এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।

নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। সব প্রক্রিয়া শেষ করে যত দ্রুত সম্ভব মরদেহ দেশে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নিহত আকরাম আলীর স্ত্রী আফরোজা পারভীন।

একসঙ্গে একই পরিবারের চার সদস্যের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজ, স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments