মানসিকভাবে সুস্থ কি না, তা নিশ্চিত না করেই হত্যা মামলায় এক আসামির বিচার শেষ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর অভিযোগ গঠনের আগেও আসামির পক্ষে রাষ্ট্রীয় আইনজীবী যথাসময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ ১৬ বছর কারাগারে থাকার পর বিষয়টি ধরা পড়ে উচ্চ আদালতের নজরে। পরে মামলার নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলেছেন, আসামির ন্যায্য বিচার নিশ্চিত হয়নি; ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি ছিল।
ফলে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পিরোজপুরের নূর মোহাম্মদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করে তাকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ। একই সঙ্গে তার মানসিক সুস্থতা পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষায় তিনি মানসিকভাবে সুস্থ প্রমাণিত হলে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে এবং মানসিকভাবে অসুস্থ থাকলে উপযুক্ত আশ্রয়কেন্দ্রে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ দেন।
আদালত বলেছেন, আসামির পক্ষে যথাসময়ে রাষ্ট্রীয় আইনজীবী নিয়োগ না দিয়ে এবং তার মানসিক সুস্থতার বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে ট্রাইব্যুনাল বিচারকাজ পরিচালনা ও শেষ করেছেন। এটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ বিচারপ্রক্রিয়া। এতে আসামি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ব্যাহত হয়েছে ন্যায়বিচার।
মানসিক সুস্থতা যাচাই না করেই বিচার
মামলার নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান, ২০১৪ সালের ২৫ মার্চ ও ১৬ জুন আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়নি। ওই বছরের ১৩ আগস্ট, ২৪ সেপ্টেম্বর ও ২৭ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালের দেওয়া তিনটি আদেশে বিচারক উল্লেখ করেন, ‘আসামি চিকিৎসার জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।’
পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। সেদিন কয়েকজন সাক্ষীর জেরা ও জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু আদালতের মতে, কোনো আসামি মানসিকভাবে অসুস্থ বলে প্রতীয়মান হলে এবং বিষয়টি আদালতের নজরে এলে বিচারককে অবিলম্বে বিচারকাজ স্থগিত রাখতে হয়। আসামির সুস্থতার বিষয়ে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করারও বিধান রয়েছে।
কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বরং আসামির মানসিক সুস্থতার বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন ছাড়াই বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। মামলার নথিতেও এমন কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি, যেখানে বলা হয়েছে যে আসামি মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন।
রাষ্ট্রীয় আইনজীবী নিয়োগেও ত্রুটি
হাইকোর্টের রায়ে আরও উঠে এসেছে, ২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। অথচ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে—এমন মামলায় অভিযোগ গঠনের আগে আসামিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়। কিন্তু সে সময় আসামির পক্ষে কোনো রাষ্ট্রীয় আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ গঠনের পর রাষ্ট্রীয় আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনিও আসামির পক্ষে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাননি। প্রথম যে আইনজীবীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তিনি আসামির পক্ষে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেননি। পরে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি পর্যাপ্ত সময় পাননি।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, যথাসময়ে রাষ্ট্রীয় আইনজীবী নিয়োগ না দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ এবং মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত না করেই বিচারকাজ পরিচালনা ও শেষ করা ছিল গুরুতর ত্রুটি। এ ধরনের বিচারপ্রক্রিয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
১৬ বছর কারাগারে, সাত বছর কনডেম সেলে
রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, ১৪ বছরের শিশু আমেনাকে হত্যার ২৩ দিন পর, ২০১০ সাল থেকেই দণ্ডিত আসামি কারাগারে রয়েছেন। এর মধ্যে কেটে গেছে ১৬ বছর। প্রায় সাত বছর তিনি কনডেম সেলে ছিলেন। এ সময়ে তাকে কখনো জামিনও দেওয়া হয়নি।
হাইকোর্ট মনে করেন, এখন যদি আইনের বিধান অনুসরণ করে মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য রিমান্ডে পাঠানো হয়, তাহলে আসামির প্রতি চরম অবিচার হবে। শুধু অবিচারই নয়, এ ধরনের পদক্ষেপ হবে আইনি প্রক্রিয়ার একটি পণ্ডশ্রম বা নিষ্ফল প্রয়োগ। এ কারণে তাকে খালাস দেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
এখন হবে মানসিক সুস্থতার পরীক্ষা
আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ভিকটিমকে হত্যার কারণ এবং ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন আদেশে আসামির মানসিক অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট তার বর্তমান মানসিক অবস্থা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে নূর মোহাম্মদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পরীক্ষায় তিনি মানসিকভাবে সুস্থ প্রমাণিত হলে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে হবে। আর যদি তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ থাকেন, তাহলে তাকে উপযুক্ত কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রসঙ্গ
২০১০ সালের ২১ মার্চ পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানায় ১৪ বছরের শিশু আমেনাকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে মামলা করেন ভুক্তভোগীর মা ফাতেমা বেগম। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় দায়ের করা মামলায় প্রতিবেশী নূর মোহাম্মদকে আসামি করা হয়।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিবেশী ও দূরসম্পর্কের চাচা নূর মোহাম্মদ আমেনাকে বাসা কাটার কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। পরে খালের পাড়ে তার লাশ পাওয়া যায়। ঘটনার ২৩ দিন পর স্থানীয় জনতা নূর মোহাম্মদকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরদিন তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। আটজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০১৯ সালে নূর মোহাম্মদকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেন। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স আসে হাইকোর্টে। দীর্ঘদিন পর সেই আপিল ও ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করে তাকে খালাস দিলেন উচ্চ আদালত।



