সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও নানা শর্ত ও শাখাভিত্তিক জটিলতায় ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রয়োজনমতো টাকা তুলতে গিয়ে অনেক গ্রাহককে শাখা পর্যায়ে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টাকা তুলতে গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করার অভিযোগও রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রাহকরা চাহিদামতো টাকা তুলতে পারবেন—এমন প্রত্যাশা নিয়ে ব্যাংকে গেলেও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন অনেকে। শাখা পর্যায়ে টাকা তোলার কারণ ও প্রয়োজন সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য টাকা তুলতে চাইলে চিকিৎসাসংক্রান্ত বিস্তারিত কাগজপত্র জমা দিতে বলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন গ্রাহক।
ভুক্তভোগী এক গ্রাহক গতকাল বলেন, নিজের জমানো টাকা তুলতে গিয়ে কেন টাকা তুলবেন, তার ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে। এমনকি মেয়াদি আমানতের (এফডিআর) মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও মুনাফা দেওয়া হবে না বলে শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গ্রাহকদের অভিযোগ, টাকা ফেরতের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ ব্যাংকের সঙ্গে অতীতে করা আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই-বাছাই করছেন কর্মকর্তারা। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী সহজে টাকা উত্তোলনের প্রত্যাশা নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে অনেকেই বিড়ম্বনায় পড়ছেন।
শরিয়াহভিত্তিক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এ উদ্যোগ নেয়। নতুন ব্যাংক গঠন করা হলেও এখনো পাঁচ ব্যাংকের শাখাগুলো পৃথকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সারা দেশে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মোট শাখা রয়েছে ৭৬১টি।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত সোমবার এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর আগে টাকা ফেরত নিতে আগ্রহী গ্রাহকদের কাছ থেকে ১ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন নেওয়া হয়। ওই সময়ে ৭৪ হাজার আমানতকারী ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরত চেয়ে ব্যাংকে আবেদন করেন।
আবেদনকারীদের ফোন করে তাদের টাকা কবে ফেরত দেওয়া হবে, তা জানানো হচ্ছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, টাকা ফেরত দেওয়ার প্রথম দিন সোমবার ৫ হাজার ৫৩২ জন গ্রাহক ২৫৪ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার ৭ হাজার ৮৯৬ জন গ্রাহক ৩২৭ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। সব মিলিয়ে দুই দিনে ১৩ হাজার ৪২৮ জন গ্রাহক ৫৮১ কোটি টাকা তুলতে পেরেছেন।
এদিকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যাংকটিকে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো গ্রাহক যেন খালি হাতে ফিরে না যান, সে জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে মুনাফা কেটে রাখার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অনেক গ্রাহক। বিশেষ করে মেয়াদি আমানতের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর টাকা তুলতে গিয়ে মুনাফা না পাওয়ার কথা জানানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার সংকটে থাকা পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে এসব ব্যাংকের আর্থিক অনিয়মের নানা তথ্য সামনে আসে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ৮০ শতাংশ ঋণ লুটপাটের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে বলে তথ্য উঠে আসে। এর ফলে ব্যাংকগুলো তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে এবং গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে সমস্যায় পড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংক পাঁচটি একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি সরকারও ব্যাংকটির একীভূত কার্যক্রম এগিয়ে নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরতের ক্ষেত্রে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য কোনো মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে আমানতকারীদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ‘হেয়ার কাট’ বা মুনাফা কর্তনের সিদ্ধান্ত বাতিল করে পুরো মুনাফা দেওয়ার ঘোষণা দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের জন্য ‘এক্সিট পলিসি’ ঘোষণা করে। এ নীতির আওতায় সব ধরনের সঞ্চয়ী হিসাবের লেনদেন স্বাভাবিক করা হয়েছে। পাশাপাশি অধিকতর প্রয়োজনের ক্ষেত্রে যেসব গ্রাহক মেয়াদি আমানত ভেঙে ‘এক্সিট’ নিতে চান, তারাও মূল টাকা তুলতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে মেয়াদি আমানতের মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। আমানত ফেরতের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে শাখা পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।



