ক্যাম্পে অস্ত্রের ঝনঝনানি, আরাকান আর্মির সঙ্গে নতুন সংঘাতের শঙ্কা

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিপুল পরিমাণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র মজুদের একটি দাবি ঘুরছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। দাবিতে বলা হচ্ছে, ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের জন্য প্রায় ১০ থেকে ১১ হাজার একে-৪৭ ধরনের স্বয়ংক্রিয় রাইফেল মজুদ করা হয়েছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে প্রায় ৭ হাজার চীনা এবং ৪ হাজার রুশ নির্মিত বলে দাবি করা হচ্ছে। আরও বলা হচ্ছে, এসব অস্ত্র ব্যবহার করে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা যোদ্ধাকে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানো হবে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ক্যাম্পকেন্দ্রিক কয়েকটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী পুনর্গঠন, অস্ত্র সংগ্রহ এবং সীমান্তের ওপারে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

ক্যাম্পে অস্ত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা

২০২৫ সালের জুলাইয়ে উখিয়ার একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও এপিবিএনের যৌথ অভিযানে আরাকান রোহিঙ্গা আর্মির (এআরএ) চার সদস্যকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়। তাদের কাছ থেকে বিদেশি তৈরি একটি ইউজি সাবমেশিনগান ও নগদ ১৪ লাখ টাকা উদ্ধারের তথ্য প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা অস্ত্র সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং অস্ত্র সীমান্তবর্তী এলাকায় পাঠানোর অভিযোগও ছিল।

এর আগে-পরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হাতে ভারী অস্ত্র ও ড্রোন যাওয়ার কথাও এসেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে সীমান্তের ওপারে আরসা ও আরএসও-সংশ্লিষ্ট তৎপরতা নিয়ে প্রতিবেদনে একাধিক রোহিঙ্গা সূত্র ভারী অস্ত্র ও ড্রোন পাওয়ার দাবি করেছিল। তবে অস্ত্রের সুনির্দিষ্ট উৎস স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক বিশ্লেষণেও ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পুনর্গঠন ও পুনরায় অস্ত্র সংগ্রহের প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। সেখানে আরসা, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ) ও রোহিঙ্গা ইসলামি মাহাজের মতো গোষ্ঠীর তৎপরতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

আরাকান আর্মির সঙ্গে সরাসরি সংঘাত

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি জোটের সঙ্গে আরাকান আর্মির বড় ধরনের সংঘর্ষের তথ্য পাওয়া যায়। পরে মার্চে আরসা-সংশ্লিষ্ট যোদ্ধারা আরাকান আর্মির একটি সরবরাহবাহী গাড়িতে হামলা চালিয়ে ড্রোন, ছোট অস্ত্র ও মর্টার গোলাবারুদ দখলের দাবি করে। ঘটনাটির ভিডিওও আরসা-সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল। উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক বিশ্লেষণে এসব তথ্যকে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

জুলাইতেও উত্তর মংডু এলাকায় আরসার সীমান্ত অতিক্রম করে হামলার খবর পাওয়া যায়। একই সময়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলা ও আরসার তৎপরতা পাশাপাশি চলায় আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে আরসার সঙ্গে জান্তার সমন্বয়ের অভিযোগ ওঠে। তবে এই অভিযোগও স্বাধীনভাবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়।

জান্তার সঙ্গে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পর্কের অভিযোগ

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও কিছু রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে।

২০২৪ সাল থেকেই রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন এসেছে যে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিভিন্নভাবে নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করছে। রয়টার্সের একটি অনুসন্ধানে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের শুরু থেকে প্রায় ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে বিভিন্ন সশস্ত্র তৎপরতার জন্য সংগঠিত করা হয়েছিল বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। অনেককে অর্থ, নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি কিংবা জোরপূর্বক নিয়োগের মাধ্যমে যুদ্ধে নেওয়ার অভিযোগও ছিল।

রেডিও ফ্রি এশিয়ার প্রতিবেদনেও মিয়ানমারের জান্তা ও আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক যুদ্ধে নেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও জান্তার সঙ্গে কিছু রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বয়ের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।

আরাকান আর্মির লক্ষ্য কি ইয়াঙ্গুন-নেপিডো দখল?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি দাবিতে বলা হচ্ছে, আরাকান আর্মি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইয়াঙ্গুন ও নেপিডোর ক্ষমতা দখল করতে চায় এবং রাখাইনকে স্বাধীন রাষ্ট্র করার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে।

উন্মুক্ত গবেষণা ও আরাকান আর্মির প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ বলছে, আরাকান আর্মি বর্তমানে মিয়ানমারের অন্য যেকোনো অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তুলনায় বেশি ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তাদের মূল রাজনৈতিক প্রকল্প হলো ঐতিহাসিক আরাকানের সার্বভৌমত্ব ও রাখাইন জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

২০২৪ সালে আরাকান আর্মির মুখপাত্র প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, তাদের লক্ষ্য পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণ ও কনফেডারেল ব্যবস্থা; তখন তারা মিয়ানমার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দাবি করছে না বলেও জানিয়েছিল। ২০২৬ সালের জুনে আরাকান আর্মি প্রায় পুরো আরাকান ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার দিকে অগ্রগতির কথা জানিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিস্তার বাংলাদেশের জন্য বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। চলতি বছর কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আবারও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাত বেড়েছে।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, মে মাস থেকে ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ড, গুলিবিনিময় ও হামলার অন্তত ছয়টি ঘটনা ঘটেছে। ২৭ আগস্ট ক্যাম্প-৮ ইস্টে প্রায় দুই ঘণ্টার বন্দুকযুদ্ধে ছয় বছরের এক শিশু ও তার মা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

এর আগে মে মাসেও দুই প্রভাবশালী রোহিঙ্গা নেতাকে হত্যার ঘটনায় ক্যাম্পে আতঙ্ক ছড়ায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তখন টহল জোরদার করে।

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও বছরের শুরুতে সতর্ক করা হয়েছিল যে, ক্যাম্পে লুকানো অস্ত্র শনাক্ত করা কঠিন এবং সেগুলো ব্যবহার করে নাশকতার ঝুঁকি রয়েছে।

সীমান্তের ওপারে যুদ্ধ, এপারে বাড়ছে উদ্বেগ

রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির লড়াইয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ সীমান্তেও। জুলাইয়ে টেকনাফ সীমান্তের ওপারে গোলাবর্ষণের শব্দ শোনা যায় এবং বিজিবি টহল জোরদার করে।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও মিয়ানমারের পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির কথা বলা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক নিয়োগ ও বাস্তুচ্যুতির অভিযোগ রয়েছে।

১৫ লাখ রোহিঙ্গাকে বান্দরবানে বাফার জোনে বসানোর পরিকল্পনা?

দাবিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো—কক্সবাজারের প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গাকে একসময় বান্দরবানের থানচির রেমাক্রি সীমান্ত ও আলীকদমের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ‘বাফার জোন’ তৈরি করে বসিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ দাবিরও নির্ভরযোগ্য সরকারি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ১৩ জুলাই ২০২৬ সরকার যে ১১ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে, তার সরকারি উদ্দেশ্য হলো রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন। কমিটির সভাপতি প্রধানমন্ত্রী এবং এতে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, অর্থ, পরিকল্পনা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়েছেন। সাম্প্রতিক সরকারি বক্তব্যেও লক্ষ্য হিসেবে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছে।

আলীকদমে নতুন উদ্বেগ অবশ্যই আছে

তবে বান্দরবানের আলীকদমকে ঘিরে রোহিঙ্গা-সংক্রান্ত নিরাপত্তা উদ্বেগ যে একেবারে নেই, তা নয়। ২০২৬ সালে আলীকদমে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়ে ভোটার করার অভিযোগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে । এ ছাড়া সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনাও অতীতে ঘটেছে। ফলে পার্বত্য সীমান্তে রোহিঙ্গা ইস্যু যে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments