রাজধানীর উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। মঙ্গলবার রাত ১২ টার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন ২৮ বছর বয়সি তাহসিফ। পরদিন বুধবার বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে উত্তরখান থানাধীন রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মৃতের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম লাশ গ্রহণ করেন। পরে বাদ আছর উত্তরা রাজউক এ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স মসজিদে জানাযা শেষে সন্ধ্যায় উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।
যেভাবে উদ্ধার হলো মরদেহ
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর আসে, উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসছে। খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন। উদ্ধারের সময় তার পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো জামা। হাতে ঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন ছিল। ওই ফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বৃহস্পতিবার জানান, মরদেহের শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না থাকায় মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মোস্তাফিজুর রহমান লাশের সুরতহাল রিপোর্ট সম্পন্ন করেন। সুরতহাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, মৃতের পরনে কালো রঙের কাবলি ফুলহাতা শার্ট ও সাদা রঙের ট্রাউজার ছিল। পেট ফুলে গিয়েছে। বাকি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল। শরীরের কোথাও কাটা-ছেঁড়া বা দাগ নেই। তবে নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিল।
বৃহস্পতিবার রাজশাহীতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার আগে সাবেক এই বিমান কর্মকর্তার মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তদন্ত ও ময়নাতদন্তের পর সব বিষয় জেনে এ বিষয়ে বলা যাবে।
‘আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে’ঃ
উত্তরা রাজউক এ্যাপার্টমেন্টের করবী নামের তিন নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে তাহসিফ বাবা মার সাথে থাকতেন। তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের অভিযোগ, তার ছেলেকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তার ছেলে আত্মহত্যা করতে পারেন না। কে বা কারা তাকে হত্যা করেছে, তা তিনি জানেন না। পুলিশের তদন্তেই বিষয়টি বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।
ঘটনার দিন তাহসিফ তার মায়ের সঙ্গে ছিলেন বলে জানান বাবা। তার ভাষ্য, সেদিন মাকে নিয়ে কেনাকাটা করার পাশাপাশি পরিবারের জন্যও কেনাকাটা করেছিলেন তাহসিফ। সন্ধ্যার দিকে ‘দ্বীপ’ নামের একজন তাকে ডাকলে মাকে বলে বেরিয়ে যান, তার সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসবেন। এরপর আর বাসায় ফেরেননি।
পরিবারের পক্ষ থেকে একাধিকবার তার ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে রাত ১টার পর মাকে বার্তা পাঠিয়ে তিনি বাসায় ফিরছেন বলে জানিয়েছিলেন। তবে এরপর তার সঙ্গে পরিবারের আর যোগাযোগ হয়নি।
তাহসিফের বাবা বলেন, বুধবার দুপুরের দিকে তিনি তুরাগ থানায় গিয়ে ছেলের খোঁজ নেন। তখন পুলিশ তার কোনো সন্ধান দিতে পারেনি। পরে বিকাল সোয়া ৫টার দিকে উত্তরখান থানার পক্ষ থেকে তাকে ফোন করা হয়। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ জানায়, তুরাগ নদে একটি মরদেহ পাওয়া গেছে। রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকায় তার ছেলে সাধারণত যেতেন না বলেও দাবি করেন বাবা।
শাহরিয়ার দ্বীপ যা বলেনঃ
উত্তরা রাজউক এ্যাপার্টমেন্টের করবী ভবনের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ি মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬ টা ১২ মিনিটে দ্বীপ ওই ভবনের নিচতলায় গাড়ি পার্কিং স্থানে মোটরসাইকেল নিয়ে যান। এর দুই মিনিট পর তাহসিফ ভবন থেকে নিচতলায় পার্কিং করা তার মোটরসাইকেলের কাছে যান। কিছুদিন আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কারণে তিনি বাইকটি আর চালাতেন না। তিনি মোটরসাইকেলটি স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। প্রায় ১০ মিনিট ধরে চেষ্টার পর মোটরসাইকেলটি স্টার্ট নেয়। এরপর তারা দুজনই মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যান।
আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপ নামের তাহসিফের এই বন্ধু তার চেয়ে বয়সে অন্তত ৫ বছরের ছোট। দ্বীপ গাজীপুরের ইসলামিক ইন্সটিটিউশন অব টেকনোলজি (আইইউটি) থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন। মোহাম্মদপুর এলাকায় তার বাসা।
দ্বীপ বলেন, তাহসিফ ভাই প্রথমেই মোটরসাইকেলটি দেখাতে ওখানকার একটি গ্যারেজে যান। সেখান থেকে তারা রাত ৯ টার দিকে উত্তরা হাউজ বিল্ডিংয়ের কাছে রুআপ শপিং কমপ্লেক্সের কুকরুক্ক নামের রেস্টুরেন্টে তারা ডিনার সারেন। সেখান থেকে রাত ১২ টার দিকে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং ইউটার্ণের কাছে তার পৃথক হয়ে যান। বাসায় যাবেন নাকি অন্য কোথাও যাওয়ার কথা বলেছিলেন- এ প্রশ্নের জবাবে দ্বীপ বলেন, ‘উনি আসলে কোথায় যাবেন এটা আমাকে ক্লিয়ার করে বলেননি। মানে যেহেতু উনি আমার বয়সে বড়, আমি সবসময় উনাকে জিজ্ঞেস করি না যে ভাই কোথায় যাচ্ছেন, এই আরকি।
“পরে আমি আমার বাসায় চলে আসি এবং ওই নিউজ থেকে হয়তবা শুনেছেন যে, রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে তিনি তার মাকে একটা ভয়েস মেসেজ পাঠান যে, ‘আমি আসছি’। তো ১টা ২০ এর মধ্যে আমি আমার বাসায় চলে আসছি, তার আর আমার বাসার মধ্যে দূরত্ব প্রায় ১৬-১৭ কিলোমিটার। মানে তার মায়ের সঙ্গে যে লাস্ট কথা হয়েছে, তার অনেক আগেই আমি বাসায় পৌঁছে গিয়েছি।”
স্বজনরা বলেছেন, মঙ্গলবার রাতে ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে তাহসিফ তার মায়ের মোবাইলে একটা বার্তা পাঠিয়ে বলেছিলেন তিনি বাসায় ফিরছেন। কিন্তু ওই বার্তায় তাকে ব্যস্ত মনে হয়েছিল বলে ভাষ্য বাবা এনায়েতুল করিমের।তবে তাহসিফের এক নিকটাত্মীয় বলেছেন, মায়ের মোবাইলে সবশেষ পাঠানো ‘ভয়েজ মেসেজটি’ তার কাছে তাহসিফের বলে মনে হয়নি।
এমনকি তাহসিফের বাইকটিরও এখন পর্যন্ত হদিস মেলেনি, যেটিসহ সামগ্রিক বিষয় নিয়ে কাজ করার কথা বলেছে পুলিশ।
বিমানবাহিনী ছাড়ার পর কর্মজীবন
১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া তাহসিফের বয়স হয়েছিল ২৮ বছর। তার বাবার নাম কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল। পরিবার নিয়ে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে বসবাস করতেন তিনি।
পরিচিতজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়াশোনা শেষে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ৭৭তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের সমমানের জয়েন্ট সার্ভিস কোর্স সম্পন্ন করে বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি সামরিক পাইলট হিসেবে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তাকে শৃঙ্খলা জনিতকারণে বরখাস্ত করা হয় বলে তাহসীফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানান। বিমানবাহিনী ছাড়ার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও নেত্র নিউজে কাজ করেন তিনি। সর্বশেষ ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেডে কর্মরত ছিলেন বলে তার বাবা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও সক্রিয় ছিলেন তাহসিফ। মৃত্যুর তিন দিন আগে রাজধানীর ভাটারায় এক অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে একটি সংবাদ প্রতিবেদন শেয়ার করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন—নিখোঁজ হওয়ার পর তার সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং কীভাবে তিনি তুরাগ নদে পৌঁছালেন। পরিবার হত্যার অভিযোগ তুললেও পুলিশ এখন পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করেনি। মরদেহে দৃশ্যমান আঘাত না থাকা এবং নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে পুলিশ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
অন্যদিকে, বিমানবাহিনী থেকে বিদায় এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ঘিরে পুরোনো বিতর্ক তার মৃত্যুর পর নতুন করে সামনে এসেছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে তার মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য নেই। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা এবং নিখোঁজ হওয়ার পর তার গতিবিধি—সব প্রশ্নের উত্তর পেতে এখন তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট এক বিবৃতিতে জানায়, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফীকে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসর দেওয়া হয়েছে। তাদের অবসরের সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার কোনো সম্পর্ক নেই বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ওই দুই কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। আইএসপিআর ওই দাবিকে বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করেছিল।
পডকাস্টের সাক্ষাৎকারে তাহসিফ দাবি করেন, বিমানবাহিনীর একটি পর্যায়ে তাকে স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন লিখে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাকে হয়রানি না করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। আবেদন দেওয়ার পরও তিনি গ্রেপ্তার বা কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি হতে চেয়েছিলেন বলে জানান। কিন্তু তার অভিযোগ, এসবের কোনোটিই না করে তাকে বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছিল।
তাহসিফ আরও বলেন, চাকরি ফিরে পেতে তিনি আপিল করেননি। তার পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়েছিল এবং এতে তাকে দীর্ঘ সময় ভুগতে হয়েছে বলে দাবি করেন। পরে পাসপোর্ট ফেরত পেলেও পাইলট হিসেবে তার ফ্লাইং আওয়ারের তথ্য না পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিমানবাহিনীর প্রতি তার ব্যক্তিগত ক্ষোভ নেই উল্লেখ করে তাহসিফ বলেন, তার অভিযোগ সেই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে কারও স্বার্থে কাজ করেছেন এবং তাকে হয়রানি করেছেন বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষ্য, স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন দেওয়ার পরও তার সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হয়েছিল।



