ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন পোশাকশ্রমিকরা। গতকাল শনিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে কয়েকটি এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। কোথাও পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, কোথাও কারখানা ও শপিং কমপ্লেক্সে ভাঙচুর, আবার কোথাও মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধের ঘটনা ঘটে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আশুলিয়ায় ১৩টি এবং কালিয়াকৈরে ১০ থেকে ১২টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে আজ রোববার মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আমিরুল হক চৌধুরী। তিনি বলেছেন, মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর শ্রমিকদের আন্দোলনে থাকার কোনো কারণ নেই।
মিরপুরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর
রাজধানীর মিরপুরে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আন্দোলনে নামেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচি পরে মিরপুর-১১ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে এসব এলাকার সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
দুপুর আড়াইটার দিকে শ্রমিকরা মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে সরে যান। তবে এর আগে দুপুর ২টা ৫ মিনিটের দিকে শাহ আলী থানাধীন হিমালয় গার্মেন্টসের নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। পরে একদল শ্রমিক কারখানাটি এবং পাশের বাগদাদ শপিং কমপ্লেক্সে ভাঙচুর চালান।
পুলিশ জানায়, এ সময় ঘটনাস্থলে প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ জন শ্রমিক ছিলেন। ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। শ্রমিকরা সরে গেলেও এলাকায় যানজটের ভোগান্তি ছিল।
আশুলিয়ায় সংঘর্ষ, ১৩ কারখানায় ছুটি
আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর, কাঠগড়া, জিরাবো ও নরসিংহপুর এলাকায় কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি পালন করেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করা বন্ধ এবং ছাঁটাই বন্ধ করা।
সকালে নিশ্চিন্তপুরের নিউ এজ অ্যাপারেলস ও নিউ এজ গার্মেন্টসের শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে আল-মুসলিম, কন্টিনেন্টাল, কাঠগড়া এলাকার এয়ার জিন্স ও নাইম সোয়েটার, নরসিংহপুরের এফএনএফ গার্মেন্টস এবং জিরাবোর টাউজার লাইনসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরাও বিক্ষোভে যোগ দেন।
এ সময় কয়েকটি স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের এক সদস্য আহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আশুলিয়ার ১৩টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
কালিয়াকৈরে মহাসড়কে আগুন
গাজীপুরের কালিয়াকৈরেও বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় তাঁরা সড়কে অবস্থান নেন। এ সময় মহাসড়কে মাটিভর্তি বস্তা, কাঠ ও বাঁশ ফেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে মহাসড়কের প্রায় সাত কিলোমিটার অংশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
শ্রমিকরা জানান, কয়েক দিন ধরে বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবিতে কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানালেও কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাঁরা কর্মবিরতি ও অবরোধে নেমেছেন। এ ঘটনায় কালিয়াকৈরের ১০ থেকে ১২টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।
মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা
শনিবার রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আমিরুল হক চৌধুরী বলেন, পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে আজ রোববার মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে। শ্রমিকদের আন্দোলনে থাকার কোনো কারণ নেই।
মন্ত্রী জানান, আগের দিন শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার আলোচনার পর মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারাও এ দাবি মেনে নিয়েছেন। বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধিও রাখা হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে আর কোনো বিরোধ থাকার কথা নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়েও মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তার ভাষ্য, আগামী ৭ তারিখের মধ্যে বেতন পরিশোধের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হবে। এতে মালিকপক্ষের আয় কমে গেলে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধেও সমস্যা হতে পারে।
মন্ত্রী শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শ্রমিকদের দাবি পূরণে সরকার ও মালিকপক্ষ উদ্যোগ নিয়েছে। তাই পোশাকশিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।



