শিল্পকলার মঞ্চে ‘টিনের তলোয়ার’

‘টিনের তলোয়ার’ নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে শেষ হলো নাটকের দল প্রাঙ্গণেমোর আয়োজিত তিনদিনের নাটক মঞ্চায়ন। গতকাল শুক্রবার সমাপনী সন্ধ্যায় একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে মঞ্চায়ন হয় নাটকটি। উৎপল দত্ত রচিত এই নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন অভিনেতা ও নাট্যকার অনন্ত হিরা।

‘টিনের তলোয়ার’ নাটকটি ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি বাস্তব চিত্র। ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ সরকার কুখ্যাত নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করেছিল। নাটকের মাধ্যমে সরকার বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠতে দেখে ব্রিটিশ সরকার শঙ্কিত হয়ে এই আইনটি তৈরি করে। এই আইনের পটভূমিকায়, বাংলা নাটকের ফেলে আসা ইতিহাসের মধ্যে তৎকালীন সমাজের নিপীড়ন নিষ্পেষণের ছবি আঁকা হয়েছে।

রাজদ্রোহমূলক নাটকগুলিকে ব্রিটিশ সরকার অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল ও নাটকের উপর সরাসরি আক্রমনও চালিয়েছিলো। এছাড়া, কিছু স্বল্প শিক্ষিত ধনপতির ব্যভিচারের ফণাও নাটকের উপর থাকত। সেই যুগপরিবেশকে এই নাটকে তুলে ধরা হয়েছে। নাটকে, বীরকৃষ্ণ দাঁ মুৎসুদ্দী ধনপতি। তার কাছে নাট্যশিল্প এবং মঞ্চের পণ্যমূল্য ছাড়া আর কোন মুল্যই নেই।

সে সময়, এই বীরকৃষ্ণদের মত একধরনের ত্রিশঙ্কু সম্প্রদায় তৈরি হয়েছিল, যারা একদিকে ইংরেজদের স্বার্থ অটুট রাখত অন্যদিকে মেকি আভিজাত্যবোধে আর টাকার অহংকারে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও নাটকে মাতব্বরি করতো। বেণীমাধব ওরফে কাপ্তেনবাবু এ নাটকের প্রধান চরিত্র। বেণীমাধবের কাছে সব কিছুর উপর শিল্পের মর্যাদা বেশি। শিল্পীর স্বাধীনতা তার কাম্য, সে স্বাধীনতা যেকোন মূল্যে লাভ করতে তিনি কুণ্ঠিত নন। বেণীমাধবের মত মানুষকে আপস করতে হয় বীরকৃষ্ণের মত কদর্য, নারীলোভী বাবুদের সাথে।

অন্যদিকে, প্রিয়নাথ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত একজন তরুণ। সে বাবু-সংস্কৃতির উত্তরাধিকার ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করে ক্রমশ শ্রেণীচ্যূত অবস্থানে পৌঁছায়। ময়নাকে ভালবেসেও বীরকৃষ্ণের খপ্পর থেকে তাকে বাঁচাতে পারে না। ময়নার মধ্য দিয়ে সে তার নিজের সম্পূর্ণতা পেতে চায়। সে চায় ময়না প্রিয়ব্রতকে নিয়ে ঘর বাঁধুক। কিন্তু ময়না, কপট মায়াকাননে থাকতে চায়।

ময়না যাকে স্বাধীনতা ভাবছে, তা যে আসলে একটা রুচিহীন ব্যাধিগ্রস্থ মুৎসুদ্দির শয্যায় দেহদান, সেটা প্রিয়নাথ তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। ময়নার ট্রাজেডি সেকালের অধিকাংশ অভিনেত্রীর জীবনেরই ট্রাজেডি। এভাবেই এগিয়ে যায় নাটকটির কাহিনী।

উনিশ শতকের বাংলা থিয়েটারের প্রেক্ষাপটে রচিত এই নাটকটি সমকালীন বাস্তবতায় এখনো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে জানান নির্দেশক অনন্ত হিরা। নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন অনন্ত হিরা, সবুক্তগীন শুভ, সীমান্ত আমীন, মশিউর রহমান, সুজয় গুপ্ত, শিশির চৌধুরী, মোফাজ্জল, বাঁধন সরকার, সাহেদ সরদার, গুলশান বহনি, নির্ঝর, তমা হোসেন, ফাহিম মুনতাসীর, নাজিম আহমেদ ত্বকি, জহিরুল ইসলাম, তন্বি ইসলাম প্রমুখ।

এর আগে গত ১ এপ্রিল বুধবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে তিনদিনের এই নাট্য মঞ্চায়ন শুরু হয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments