দীর্ঘ ছয় বছর পর আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে দেশের ‘দ্বিতীয় সংসদ’ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। এ নির্বাচনকে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এখন উৎসবমুখর; এমন প্রাণবন্ত আমেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে কখনো দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ডাকসু শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং জাতীয় জীবনের সংগ্রাম-আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে সম্মুখ সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছে এই সংসদ। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি ছিল ডাকসু নির্বাচন, যা আজ পূর্ণতা পাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, ডাকসু হতে হবে একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান যেখানে সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করবেন। তারা এমন প্রার্থীকে বেছে নিতে চান, যিনি মেধাবী, স্বচ্ছ ও শিক্ষার্থীবান্ধব নেতৃত্বগুণসম্পন্ন। বিশেষ করে যারা শিক্ষাবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়ন, ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকেছেন এবং ভবিষ্যতেও আন্তরিকভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন, তারাই ভোটারদের অগ্রাধিকারে রয়েছেন।
ডাকসু নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা জানান ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী ইকবাল মাহী। তিনি বলেন, ছয় বছর পর উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ডাকসু নির্বাচন। এমন প্রাণবন্ত আমেজ আগে কখনো ক্যাম্পাসে দেখা যায়নি; সবার আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখে মনে হচ্ছে, ডাকসুর মধ্য দিয়ে নতুন এক রাজনীতির যাত্রা শুরু হচ্ছে। এখন প্রত্যাশা একটাই একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। তিনি আরও বলেন, অনেকে ডাকসুর কর্মপরিধি না জেনেই বিশাল ইশতেহার ঘোষণা করছেন। কিন্তু প্রয়োজন শিক্ষার্থীবান্ধব সংস্কার। এজন্য হলে শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং একাডেমিক সংস্কারের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী তামান্না আক্তার বলেন, আমাদের স্বপ্নের ডাকসু হবে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত বন্ধু। আবাসনের সংকট নিরসন, লাইব্রেরি ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণই হবে মূল লক্ষ্য। দখলদার রাজনীতি বা সহিংসতা নয়, আমরা চাই স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব। পাশাপাশি ডাকসু হবে সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার উৎসবমুখর মঞ্চ; গড়ে তুলবে আধুনিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস।
কবি জসিমউদ্দীন হলের শিক্ষার্থী মুনতাসীর মামুন মনে করেন, একমাত্র ডাকসুর মাধ্যমেই কার্যকর প্রতিনিধি পাওয়া সম্ভব। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের সমস্যার কথা শুনবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। হলে খাবার, সিটসহ নানা সংকট সমাধানে তাদের ভূমিকা রাখতে হবে।
রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফ মাহমুদ বলেন, ডাকসুর মূল কাজ হলো শিক্ষার্থীদের সেবা করা ও তাদের কণ্ঠস্বর হওয়া। কিন্তু বাস্তবে দলীয় প্রভাবই বেশি দেখা যায়। চল্লিশ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র একটি অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসার জন্য দূরের প্রাইভেট হাসপাতালে ছোটাছুটি, হলে আবাসনের সংকট ও খাবারের অব্যবস্থাপনা এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি কার্যকর ছাত্র প্রতিনিধি না থাকার কারণে।
শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ডাকসু তার অতীতের গৌরব ফিরে পাবে এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে তাদের অধিকার ও কল্যাণে আন্তরিকভাবে কাজ করবে।



