আর্ন্তজাতিকভাবে কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয় কারিগরি শিক্ষাকে। উন্নত অনেক দেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হারও বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে চাকরি না পেয়ে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহ দিন দিন হারিয়ে ফেলছেন শিক্ষার্থীরা। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাড়লেও ধারাবাহিকভাবে কমছে শিক্ষার্থী। দেশের ১২ হাজার কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গত পাঁচ বছর ধরে অর্ধেকের বেশি আসন ফাঁকা ছিল । এছাড়া নতুন টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক এবং অধ্যক্ষের পদ অর্ধেক শূন্য রয়েছে। দেশীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিকুলাম প্রণয়নের তাগিদ দিয়ে শিক্ষবিদরা বলেন, দেশে কারিগরি শিক্ষার অবকাঠামো সম্প্রসারণ হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার মান নিশ্চিত করা যায়নি। পুরনো পাঠক্রম, অপর্যাপ্ত শ্রেণীকক্ষ-ল্যাব, দক্ষ শিক্ষকের অভাব ও দুর্বল ব্যবস্থাপনাসহ নানা সমস্যা জর্জরিত কারিগরি শিক্ষা। নেই হাতে-কলমে শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ। সনাতন শিক্ষার কারণে আন্তর্জাতিক স্তরে সমমর্যদা পাচ্ছে না বাংলাদেশের ডিপ্লোমা। ফলে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজগুলোয় (টিএসসি) শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য নির্ধারিত আসনের বেশিরভাগই প্রতি বছর ফাঁকা থাকছে। এমনকি এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাজীবন শেষে উপযুক্ত কর্মসংস্থানেরও অভাবে রয়েছে। ফলে বেকার সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। ন্যানো টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, রোবটিকস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ইন্টারনেট অব থিংস, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ব্লকচেইন টেকনোলজিসহ আধুনিক বিষয়গুলো কারিগরি পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির পরামর্শ দেন শিক্ষাবিদরা।
দেশে উন্নত প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এক দশকে বিনিয়োগ হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কারিগরি শিক্ষা খাতেও বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়। এর মধ্যে অন্যতম ৪২৯টি উপজেলায় ৪২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) নির্মাণের দুটি প্রকল্প। একটি প্রকল্পে ১০০টি এবং আরেকটি প্রকল্পের অধীন নির্মাণ হচ্ছে ৩২৯টি প্রতিষ্ঠান। চলতি বছর পর্যন্ত এগুলোর মধ্যে ৯১টি টিএসসিতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষকের পদ শূন্য। প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ শিক্ষক ও প্রচারণার অভাবসহ বিভিন্ন কারণে এ প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পর এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষাবর্ষেই আসন সংখ্যা অনুযায়ী শিক্ষার্থী পায়নি। প্রকল্প দুটির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু ৩৩৮টি টিএসসির নির্মাণকাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। কারিগরি বোর্ডের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল এমন ১৪৯টি টিএসসির প্রায় ৬২ শতাংশ আসনই ছিল ফাঁকা। এর মধ্যে ১৩৬টি টিএসসিতে চালু ছিল নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা কার্যক্রম। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট আসন সংখ্যা ২৬ হাজার ৬৫০। এর বিপরীতে শিক্ষার্থী ভর্তি হয় ১০ হাজার ৬০৩ জন। অর্থাৎ প্রায় ১৬ হাজার ৪৭টি আসনই শূন্য, যা মোট আসনের ৬০ দশমিক ২১ শতাংশ। একই অবস্থা এসএসসি (ভোকেশনাল) ও এইচএসসি (ভোকেশনাল) কোর্সেও। এসএসসি (ভোকেশনাল) কোর্স চালু আছে ১৪৯টি প্রতিষ্ঠানে এবং আসন সংখ্যা ১ লাখ ৫ হাজার ৬০০। এর বিপরীতে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি হয় ৩৮ হাজার ৬২০ জন। আসন ফাঁকা ছিল ৬৬ হাজার ৯২০টি, যা মোট আসনের ৬৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এইচএসসি (ভোকেশনাল) কোর্সে ১৪৯টি প্রতিষ্ঠানে আসন সংখ্যা ২৪ হাজার ৫০। শিক্ষার্থী ভর্তি হয় ৯ হাজার ৯৯ জন। আসন ফাঁকা ছিল ১৪ হাজার ৯৫১টি, যা মোট আসনের ৬২ দশমিক ১৬ শতাংশ। সব মিলিয়ে ১৪৯টি প্রতিষ্ঠানে মোট আসন ছিল দেড় লাখের বেশি। নির্মাণাধীন ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠান চালু হলে আসন বাড়বে প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৯২০টি।
শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে না: কারিগরি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোয় ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রি-ভোকেশনাল এবং নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত কমপক্ষে চারটি করে ট্রেডে পড়াশোনা করানো হয়। এছাড়া এসএসসি (ভোকেশনাল) ও এইচএসসি (ভোকেশনাল) কোর্সসহ বিভিন্ন ট্রেডের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বর্তমানে সব কোর্স চালু আছে এমন প্রতিষ্ঠানে বেশির ভাগ আসন ফাঁকা থাকছে। আগের ৬৪টিসহ বর্তমানে ১৫৫টি টিএসসির কার্যক্রম চালু রয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৪২৯টি টিএসসি নির্মাণে ব্যয় হবে মোট ২৩ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। আওয়ামী সরকারের আমলে দুই দফায় সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। কারিগরি শিক্ষার মান না বাড়িয়ে নতুন প্রতিষ্ঠান নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা বাড়ানো খুবই জরুরি। শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে না। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবে এ খাতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্ররা পিছিয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে বাজারের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে নেওয়া হচ্ছে কিনা, এতে কী ধরনের কারিকুলাম হবে, বৃত্তিমূলক শিক্ষার পাশাপাশি আদর্শ শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে কিনা এবং যন্ত্রপাতিগুলো আধুনিক কিনা সে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার।
১০০ টিএসসি নির্মাণে দুই বছরের প্রকল্প ১০ বছরেও শেষ হয়নি: জানা গেছে, ১০০টি উপজেলায় একটি করে টিএসসি নির্মাণের প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল ২০১৪ সালে। ওই সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯২৪ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে এসব টিএসসি নির্মাণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের সিকিভাগও বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাড়ানো হয় বরাদ্দের পরিমাণ ও মেয়াদ। দুই বছর মেয়াদের সে প্রকল্প ২০২৫ সালে এসেও শেষ হয়নি। সম্প্রতি কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এ নিয়ে ১২ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা (পিইসি) অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় প্রকল্পটির মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ানোরও প্রস্তাব করায় প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়াবে ২ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বাস্তবায়ন অগ্রগতি ছিল ৭৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। এদিকে, ২০১৪ সালের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শেষ না করেই ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আরো ৩২৯টি টিএসসি নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। সমসংখ্যক উপজেলায় এসব প্রতিষ্ঠান নির্মাণ হওয়ার কথা। এক্ষেত্রে প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এ প্রকল্পেরও মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজন হতে পারে।
জনশক্তি রফতানির অর্ধেকের বেশি অদক্ষ: কারিগরি শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য বিদেশী শ্রমবাজারের জন্য দক্ষ কর্মী তৈরির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি। তবে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) এক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী গেছেন ১০ লাখ ১১ হাজার ৯৬৯ জন। তাদের মধ্যে দক্ষ কর্মীর সংখ্যা মাত্র ২ লাখ ১৪ হাজার ৪৪, যা গত বছর মোট বিদেশগামী কর্মীর ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। একই সময়ে স্বল্পদক্ষ কর্মী (অদক্ষ) হিসেবে বিদেশে গেছেন ৪ লাখ ৯১ হাজার ৪৮০ জন বা ৫৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জনশক্তি রফতানির অর্ধেকের বেশি অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশে যাচ্ছেন। এছাড়া আধা-দক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশে গেছেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ১২৮ জন বা ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
কম বেতনে আগ্রহ কমছে: জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমিতে (নায়েম) ২০২১ সালে জমা দেওয়া এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ কর্মজীবী, ৪ শতাংশ উদ্যোক্তা, ৩৮ শতাংশ বেকার ও ৪ শতাংশ কাজে আগ্রহী নয়। তবে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বেকারত্বের হার বেশি। গ্রামাঞ্চলের মাত্র ৪৮ শতাংশ ডিপ্লোমাধারী কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন। সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ২৭২ ডিপ্লোমাধারীর ওপর ঐ গবেষণা করা হয়। ঐ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কর্মজীবীদের ৬৫ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, ২৪ শতাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে, ৬ শতাংশ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বা এনজিওতে ও ৫ শতাংশ কাজ করছেন সরকারি প্রতিষ্ঠানে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এ ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের ৪৪ শতাংশের মাসিক আয় ১০-১৫ হাজার টাকার মধ্যে এবং ৪৩ শতাংশের আয় ১০ হাজার টাকার কম। মাসে ১৫ হাজার টাকার ওপরে আয় করেন মাত্র ১৩ শতাংশ সনদধারী। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর ডিগ্রি নিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭১ শতাংশ বেতন পাচ্ছে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। দক্ষতার ঘাটতিকেই এসবের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, দেশে কারিগরি শিক্ষায় অনুন্নত কারিকুলাম ও পুরোনো কোর্স আছে, যা চাকরির বাজারের সঙ্গে অসামঞ্জস্য। এছাড়া কারিগরি শিক্ষার্থীদের যেসব যন্ত্রপাতির ব্যবহার শেখানো হচ্ছে, তা গত শতাব্দীর। শিল্পকারখানা এসব যন্ত্রপাতির ব্যবহার বন্ধ করে নতুন প্রযুক্তি আনছে। শিল্পের উপযোগী আধুনিক জ্ঞান তৈরি না হওয়ায় নিয়োগদাতারা চাকরিপ্রার্থীদের ওপর সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ল্যাবরেটরি ও শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী নয়। দক্ষ শিক্ষকেরও অভাব আছে। এতে কারিগরি শিক্ষার মানে ঘাটতি থাকছে। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগও কম। আবার বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারছে না দেশের কারিগরি শিক্ষা। এ কারণে পড়াশোনা শেষে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক সহজে চাকরি পেলেও বেতন-ভাতা খুবই কম পান।
পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে হতাশার চিত্র: বিগত পাঁচ বছরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মোট শিক্ষার্থী ভর্তি হয় ৮১ হাজার ৭৬ জন। ঐ শিক্ষাবর্ষে আসন ফাঁকা ছিল ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ। তার পরের শিক্ষাবর্ষে ৭৭ হাজার ২৭২ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও ৫৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ ছিল শূন্য আসন। এছাড়া ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ছিল ৭৩ হাজার ২৭২ জন, ফাঁকা আসন ৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশ; ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয় ৭১ হাজার ৫৫৩ শিক্ষার্থী, আর ফাঁকা পড়ে ছিল ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ আসন। অথাৎ কারিগড়ি শিক্ষার্থীর পরিমান দিন দিন কমছে। এদিকে ২০১২ সালে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, ২০২০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার্থী হবে ২০ শতাংশ। বর্তমানে বলা হচ্ছে শিক্ষার্থীর হার ১৬ শতাংশ। তবে আন্তর্জাতিক কারিগরি শিক্ষার সংজ্ঞা ও ব্যানবেইসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি মূলত ৯ শতাংশ; অর্থাৎ এক যুগেও লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও অর্জিত হয়নি। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন পলিটেকনিক, মনোটেকনিক এবং কারিগরি স্কুল ও কলেজে শিক্ষক পদের ৭০ শতাংশই শূন্য আছে। ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। ৩২টি ট্রেডে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ার সুযোগ আছে। অবশ্য সব প্রতিষ্ঠানে সব ট্রেড নেই। মূলত এসএসসি পাশের পর চার বছর মেয়াদি এসব কোর্সে ভর্তি করা হয়। দেশে ৫৬টি সরকারি ও ৫৭২টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে এসব কোর্সে পড়ানো হয়। ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আটটি ট্রেড আছে। ১৮টি সরকারি ও ২১৬টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কোর্সে শিক্ষা দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে আসন আছে ৩৮ হাজার ৫৫০টি। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৯৯ জন। এখানেও পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন।
নতুন প্রযুক্তির অভাবের কথা স্বীকার করলেন শিক্ষা উপদেষ্টা: শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার (সি আর আবরার) গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বলেন, কারিগরি শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত, এখানে কাঠামোগত সংস্কার দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রেডভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও নতুন প্রযুক্তির অভাব আছে। এসব দূর করার জন্য কারিগরি শিক্ষাকে আরও যুগোপযোগী করার পদক্ষেপ নিতে হবে।
অভিভাবকরা এখনো মেধাবী সন্তানকে কারিগরি প্রতিষ্ঠানে পড়াতে চান না: বোর্ড চেয়ারম্যান: কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা থাকার বিষয়ে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, চীনসহ যেসব দেশের অর্থনীতি দ্রুততম সময়ে বিকাশিত হয়েছে, যেসব রাষ্ট্র দ্রুত উন্নতি করেছে, তারা সবাই কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমেই তা সম্ভব করেছে। বাংলাদেশকেও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে হলে কারিগরি শিক্ষায় জোর দিতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এ কারণেই প্রতিষ্ঠান বাড়ানো হচ্ছে। তবে আমাদের এখানে শিক্ষক সংকট, প্রচারণার ঘাটতি, কারিগরি শিক্ষার বিষয়ে জনসচতেনতার অভাবসহ বেশকিছু সংকট রয়েছে, যা কারিগরি শিক্ষার প্রসারে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষত কারিগরি শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নেতিবাচক ধারণা এক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। বেশির ভাগ মানুষই এ শিক্ষার যথাযথ প্রয়োগ ও গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত নন। তারা মনে করেন এটি কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য। অভিভাবকরা এখনো মেধাবী সন্তানকে কারিগরি প্রতিষ্ঠানে পড়াতে চান না। এছাড়া সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও চায় না তাদের শিক্ষার্থীরা কারিগরিতে আসুক। নানাভাবে তারা শিক্ষার্থীদের বাধাগ্রস্ত করে। এসব কারণেই আসন ফাঁকা থাকে। তাই প্রচারণা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা এ ধারায় আগ্রহী হয়। মো. রুহুল আমিন আরো বলেন, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলোয় যে শিক্ষক সংকট রয়েছে তা দ্রুততম সময়ে নিয়োগের মাধ্যমে দূর করার চেষ্টা চলছে।
প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তদারকি ও মূল্যায়ন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, পৃথিবীর উন্নত বিশ্বের দেশগুলো যেমন চীন, জাপান, জার্মানি এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারত কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে সর্বোচ্চ ফলাফল নিশ্চিত করতে পেরেছে। আমাদের দেশেও প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরির মানোন্নয়নের বিষয়টি খুব গুরত্ব সহকারে দেখছি। এই নিয়ে বেশ কয়েকটি ওয়ার্কশপ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেব। এছাড়া পলিটেকনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছি। আগে থেকে চলমান নানা প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে অবকাঠামো উন্নয়ন, কারিকুলাম আধুনিকায়ন, ভর্তি নীতিমালায় পরিবর্তন এবং শিল্প খাতের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তদারকি ও মূল্যায়ন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।



