পোষ্যকোটা ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি কমসূচিতে অচল রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়

পোষ্যকোটা ইস্যুতে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের পাল্টাপাল্টি কমসূচিতে অচল হয়ে পড়েছে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাস। শনিবার দিবাগত গভীর রাত পর্যন্ত হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী উপাচার্যের বাসভবনের সামনের প্যারিসরোডে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিয়ে পোষ্যকোটা বাতিলের একদফা কর্মসূচি পালন করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাত ১টার দিকে বাসভবনের গেটে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ্ হাসান নকীব, পোষ্যকোটায় ভর্তির কার্যক্রম স্থগিত এবং জরুরী সি-িকেট সভা আহবানের ঘোষণা দেন। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুকে পোস্টে জানানোর পর শিক্ষার্থীরা হলে ফিরে যান। তবে সিন্ডিকেটে পোষ্যকোটা বাতিল না হলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান শিক্ষার্থীরা।
এদিকে গতকাল রবিবার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ডাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল থেকে বিশ^বিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি ফলকের সামনের লিচুতলায় অবস্থান নেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জরুরী সেবা ও রাকসু নির্বাচনী কার্যক্রম ছাড়া বিশ^বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সবধরনের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তবে গাছতলায় ক্লাস নিয়েছেন আইন বিভাগের শিক্ষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) পোষ্য কোটা পুনর্বহাল ও শিক্ষক লাঞ্ছনার বিচারের দাবিতে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এর মধ্যেই টুকিটাকি চত্বরের গাছতলায় ক্লাস ও শিক্ষঅর্থীদের উপস্থিতিও নিয়েছেন আইন বিভাগের অধ্যাপক মুর্শেদুল ইসলাম পিটার। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা বৈষম্য করার কারণে পালিয়েছেন। এই প্রশাসন এসেছে বৈষম্য দূর করার জন্য। তাহলে এখন বৈষম্য করবে কেন? পোষ্যকোটা কয়েকবার বাতিল, আবার আন্দোলনের মাধ্যমে ফিরিয়ে এনেছে। শিক্ষক-কর্মকর্তারা চাচ্ছেন, তাদের সন্তানকে ভর্তি করতে, আর প্রশাসন চাচ্ছেন আন্দোলন হোক। আমি বিশ্বাস করি, আমার ছাত্ররা শিক্ষকদের ওপর আঘাত করবেন না। তারা যে অভিযোগ এনেছেন, তা প্রমাণ করুক।’ তবে শিক্ষক-কর্মখর্তাদের কর্মবিরতি কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকলেও রবিবার রাকসু নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণাও ছিল খুবই সীমিত ও সংকুচিত।
অণ্যদিকে রবিবার বিকাল ৩টায় উপাচার্যের বাসভবনস্থ লাউঞ্জে সি-িকেটের জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সি-িকেট সভাপতি ও উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব সভাপতিত্ব করেন। সভা শেষে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে প্রেসব্রিফিং করেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতেখারুল আলম মাসউদ। এসময় তিনি বলেন, গতকাল উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিনসহ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের লাঞ্ছনার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে সিন্ডিকেট। এছাড়া শনিবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত ঘটনাবলী তদন্তের জন্য দু’টি কমিটি গঠনের সুপারিশ করেছে সি-িকেট। একটি ৫ সদস্য বিশিষ্ট বিশ^বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীন কমিটি এবং আরেকটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি।
ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার বলেন, যথাসময়ে রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কারণ রাকসু স্বতন্ত্র বডি। ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের ধৈর্য ও আন্তরিক সহযোগীতা চেয়েছে সিন্ডিকেট।
তিনি আরও বলেন, শনিবার রাতে শিক্ষার্থীদের সামনে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধায় পোষ্যকোটায় ভর্তির কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব। সি-িকেট উপাচার্যের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে। এছাড়া সি-িকেটে আর কোনো নতুন সিদ্ধান্ত হয়নি।
যেভাবে শান্ত শিক্ষার্থীরা
গতকাল শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামনে আসেন উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব। এসময় তিনি মাইকে পোষ্যকোটায় ভর্তির কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা এবং রবিবার জরুরী সি-িকেট সভা আহবানের ঘোষণা দেন। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিজ্ঞপ্তি আকারে পোস্ট করা হয়। এতে বলা হয়, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্যকোটায় ভর্তির কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতিতে রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) জরুরী সি-িকেট সভা আহ্বান করা হয়েছে।’
শিক্ষক লাঞ্ছনায় জড়িতদের বহিষ্কার দাবি
পূর্ণদিবস কর্মবিরতি চলাকালে বিশ^বিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দাবি, ‘শনিবার যারা শিক্ষকের গায়ে হাত দিয়েছে, তাদের আজ রবিবারের মধ্যেই বহিষ্কার করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কর্মবিরতি চলমান থাকবে। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলমান কর্মসূচিতে রবিবার কোনো শিক্ষককে দেখা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার্স সমিতির সভাপতি মুক্তার হোসেন বলেন, ‘গতকাল (শনিবার) ছাত্র নামধারী কিছুসংখ্যক সন্ত্রাসীর কর্মকান্ডের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিনসহ বেশকিছু শিক্ষক শারীরীকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন। তাদের বাসায় ঢুকতে ও খাবার খেতে দেওয়া হয়নি। এদেরকে চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
রাকসু জরুরী সেবায় রেখে ‘শাটডাউন’ ঘোষণা
পোষ্যকোটা নিয়ে আন্দোলন কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের দ্বারা শিক্ষক লাঞ্ছিতের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) কমপ্লিট শাটডাউনের ঘোষণা দিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের (রাকসু) কার্যক্রম জরুরী সেবার আওতায় শার্টডাউনের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টায় শহীদ বুদ্ধিজীবী চত্বরে রাবি অফিসার সমিতির কোষাধ্যক্ষ মাসুদ রানা এই ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘শনিবারের হামলায় যে সাবেক শিক্ষার্থীরা জড়িত ছিল, তাদের বিশ^বিদ্যালয়ের আইনে ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে। দাবি মানা না হলে সোমবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কমপ্লিট শাটডাউন চলবে। তবে রাকসুর সব কার্যক্রম এর বাইরে থাকবে।’
রাকসু নির্বাচন প্রসঙ্গে অফিসার্স সমিতির সভাপতি মুক্তার হোসেন বলেন, ‘আমাদের চলমান আন্দোলন কোনো প্রভাব ফেলবে না। রাকসু নির্বাচনকে আমরা আন্দোলন কর্মসূচির বাহিরেই রেখেছি। গত শনিবার শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে পূর্ণদিবস কর্মবিরতির ডাক দিয়েছিলেন শিক্ষক-কর্মকর্তারা। ফলে মাত্র চারদিন আগে এই কর্মসূচি ঘোষণায় রাকসু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ফলে রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে শিক্ষার্থীদের তেমন প্রচার-প্রচারণা দেখা যায়নি। হাতে গোনা কয়েকজন প্রার্থীকে লিফলেট বিতরণ করতে দেখা যায়।
রাকসু নির্বাচন ২৫ সেপ্টেম্বরই
রাকসু নির্বাচনের বিষয়ে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. সেতাউর রহমান বলেছেন, ‘শনিবারের ঘটনায় আমাদের নির্বাচনী কোনো কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে এখনো মনে করছিনা। নির্বাচন কমিশন সকল ধরণের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। রাকসু নির্বাচন যেহেতু আমাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, তাই আমরা সকল পক্ষের সহোযোগিতা চাইছি। উপাচার্য স্যারও আমাদের সবধরণের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে নির্দেশনা দিয়েছেন। ২৫ তারিখেই রাকসু নির্বাচন হবে। আমরা আমাদের চূড়ান্ত নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষক কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তারা বলেছেন, জরুরী সেবা ও রাকসু নির্বাচন আন্দোলনের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।’
উল্লেখ্য, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে গত ২ জানুয়ারি পোষ্যকোটা বাতিল ঘোষণা করেন উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব। এরপর থেকে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা হিসেবে ধারাবাহিক আন্দোলন শুরু করেন। সর্বশেষ গত ১৭ সেপ্টেম্বর স্মারকলিপিতে ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা নিশ্চিত না হলে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির ঘোষণা দেন শিক্ষক-কর্মকর্তারা। এরপর গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকালে জরুরী একাডেমিক কমিটির সভায় ১০টি শর্তে পোষ্যকোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।
‘শিক্ষকেরা পিতৃতুল্য’ : আম্মার
পোষ্যকোটা বাতিল আন্দোলনের প্রধান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার শনিবার ‘শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি’র ঘটনায় ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ‘শিক্ষকেরা পিতৃতুল্য, তাদের গায়ে হাত তোলা হয়নি; বরং প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কয়েকজন তার ও শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়েছেন বলে পাল্টা অভিযোগ করেন তিনি। রবিবার এ বিষয়ে ফেসবুকে একাধিক স্ট্যাটাস দিয়েছেন সালাউদ্দিন আম্মার। পোষ্যকোটা বাতিলের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। তার নেতৃত্বেই প্রথমে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিনের গাড়ি আটকে দেওয়া হয়। উপ-উপাচার্যের বাসভবনের ফটকে তালা লাগানো হয়। এরপর জুবেরী ভবনের প্রবেশপথে উপ-উপাচার্য ও অন্যান্য শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সামনে হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যান। একপর্যায়ে সেখানে তাদের সঙ্গে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি হয়। বিভিন্ন ভিডিওতে এর মধ্যে সালাউদ্দিন আম্মারকে দেখা যায়। স্ট্যাটাসে সালাউদ্দিন আম্মার আরও বলেছেন, ‘স্যাররা আমাদের পিতৃতুল্য। স্যারদের সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। তাই কাউকে ব্যক্তিগতভাবে অ্যাটাক বা অশালীন ভাষা ব্যবহার করিনি আমরা। আমাদের ভাইদের অনশনের ২৪ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হলেও নোটিশ প্রত্যাহারে প্রশাসনের কোনো ইচ্ছা না দেখে আমাদের এ জায়গায় আসতে হয়েছে।’ শনিবারের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘স্যাররা ডিসিশন ছাড়া যেন না যান, তার জন্য প্রশাসন ভবন, বাসভবনের গেট, জুবেরী ভবনের সামনে আমরা হিউম্যান চেইন (মানববন্ধন) করে দাঁড়িয়ে যাই। ওনারা জোরপূর্বক আমাদের হাত সরিয়ে ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তখন ছত্রভঙ্গ হয়ে সবাই স্যারদের আটকাতে চেষ্টা করেন। কারও গায়ে হাত দিইনি।’ তবে পুরো ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়ে সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘তারপরও যতটুকু হয়েছে, সেটার সবটার জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments