শেখ হাসিনাসহ দায়ী সকলের বিচার চাই

জুলাই গণআন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ যারা দায়ী তাদের সকলের বিচার চেয়েছেন এক সাক্ষী। রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি এই বিচার প্রার্থনা করেন। সাক্ষী আলী আহসান জুনায়েদ তার সাক্ষ্যে বলেন, জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকান্ডের জন্য শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য যারা জড়িত তাদের সকলের বিচার চাই। বিচারপতি মো. গোলাম মুর্তজা মজুমদারের নের্তৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি রেকর্ড করেন। সাক্ষী জুনায়েদ জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক সংঘটন “ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ” এর প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক।
জবানবন্দিতে তিনি ২০১৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের চিত্র ধারাবাহিকভাবে ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেন। সাক্ষ্যে তিনি বলেন, কোটা পদ্ধতি থাকার ফলে মেধাবীদের চাকুরী পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এই সুবিধা গ্রহণের জন্য অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টি হয়। যার ফলে শিক্ষার্থীরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়। গোপালগঞ্জের লোকেরাই কোটার সুযোগ সবচাইতে বেশি পেতে থাকে। ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে ব্যর্থ হয়ে শেখ হাসিনা কোটা পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করে দেন। ২০২৪ সালে এই কোটা পদ্ধতি পুনর্বহাল হয় হাইকোর্টের রায়ে। এরপরই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সেখান থেকে কোটা বাতিলের পূর্বের সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেধে দেয়। কোটা পদ্ধতি বাতিল না করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে ১৬ জুলাই রাজপথে নামে শিক্ষার্থীরা। এতে পুলিশের গুলিতে রংপুরে আবু সাঈদ, চট্টগ্রামে ওয়াসিম, শান্ত ও ফারুকসহ মোট ৬ জন শহীদ হন। আন্দোলন থামানোর জন্য আন্দোলনকারীদের সাথে সরকারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। ছাত্রদের আন্দোলন বন্ধ করতে বলা হয়।
তিনি বলেন, ২১ জুলাই ৯ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়। সেখানে গণহত্যার দায় স্বীকার করে শেখ হাসিনাকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে যাত্রাবাড়ী থেকে চিটাগাং রোড এলাকায় শতাধিক ব্যক্তি নিহত ও কয়েক শতাধিক আহত হয়। এ সময়ের মধ্যে প্রায় ১৩৪ জনের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে রায়ের বাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। ২ শতাধিক মামলায় প্রায় ২ লক্ষাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। তিনি বলেন, সরকার পক্ষ থেকে ৩০ জুলাই শোক দিবস ঘোষণা করা হলে তা প্রত্যাখ্যান করে চোখে মুখে লাল কাপড় বেধে প্রতিবাদ কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। ফেসবুক প্রোফাইল লাল করার কর্মসূচী ব্যাপকভাবে সাড়া পড়ে। ড. মুহাম্মদ ইউনুসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের ফেসবুক প্রোফাইল লাল হয়ে যায়।
সাক্ষ্যে জুনায়েদ বলেন, ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সরকার পতনের এক দফা কর্মসূচী ঘোষণা করেন নাহিদ ইসলাম। ৪ আগস্ট পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ সম্মিলিতভাবে আন্দোলনকারীদের উপর সশস্ত্র হামলা চালায়। সেদিন অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ও আহত হয়। ঐ দিন প্রথমে ৬ আগস্ট “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়। তবে ৪ আগস্ট রাতে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচী একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট করার ঘোষণা দেন। পরদিন বেলা ২টার সময় সেনা প্রধান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিবেন, তখন আমরা আন্দোলনকারীরা বুঝতে পারি যে, শেখ হাসিনা সম্ভবত ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। বেলা আনুমানিক ৩ টার সময় সেনা প্রধান শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন বলে ঘোষণা দেন।
এর আগে এই মামলার ৪৭ তম সাক্ষী এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলামকে জেরা করেন পলাতক শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত কৌসুলি আমির হোসেন। তারা নানা প্রশ্নের জিজ্ঞাসার জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনে দেশি-বিদেশি শক্তির কোন হাত ছিলো না। আর রাষ্ট্রপতি নিজমুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগের কথা বলেছেন। আর এটা সত্য যে তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এ সময় ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর এম. তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, মো. মিজানুল ইসলাম, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments