জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই রায়ে সাত আসামির মধ্যে পাঁচজনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বশীদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও দলটির নেতা আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
মামলার সাত আসামিই বিচার শুরুর পর থেকে পলাতক রয়েছেন। তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর এম আমিনুল ইসলাম।
রায়ে ওবায়দুল কাদেরকে তিনটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নাছিমকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং একটি অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আরাফাত ও শেখ পরশকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং একটি অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। নিখিলকে তিনটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ও একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাদ্দাম ও ইনানকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং দুটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ
মামলায় প্রসিকিউশনের অভিযোগ ছিল, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ দলটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসী বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জুলাই আন্দোলনের সময় নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক ও পরিকল্পিত হামলা চালায়। এতে বহু আন্দোলনকারী নিহত ও আহত হন।
প্রসিকিউশনের দাবি, আসামিরা ষড়যন্ত্র, নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা, সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততার মাধ্যমে এসব অপরাধ সংঘটনে ভূমিকা রাখেন। অপরাধ সম্পর্কে জানার পরও তাঁরা তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেননি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।
প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের পরদিন ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা আসে।
এ ছাড়া ১৯ জুলাই আওয়ামী লীগের বৈঠক শেষে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য এবং ৩ আগস্ট ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের আন্দোলন দমনে নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাও মামলায় অভিযোগ হিসেবে আনা হয়।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নির্দেশনা ও কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু আন্দোলনকারী নিহত ও আহত হন।
মামলায় ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত ১৭ আগস্ট যুক্তিতর্ক শেষে ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। মঙ্গলবার সেই রায় ঘোষণা করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এর আগে গত বছরের ১৭ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মঙ্গলবারের রায়সহ এ পর্যন্ত সাতটি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৬৮ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে; তাঁদের মধ্যে ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৮ জন পলাতক রয়েছেন।



