রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে (রাবি) টানা ৫দিন ধরে চলমান ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ অবশেষে স্থগিত করেছে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকাল সাড়ে ৩টায় শহীদ বুদ্ধিজীবী চত্ত্বরের সামনে প্রেস ব্রিফিংয়ে শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক মোঃ আব্দুল আলীম শাটডাউন স্থগিতের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
উল্লেখ্য, গত ২০ সেপ্টেম্বর প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা হিসেবে শিক্ষক-কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সন্তানদের বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির (পোষ্য কোটা) ইস্যুতে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন, প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান ও কয়েকজন সহকারী প্রক্টরসহ কয়েকজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে লাঞ্চিত করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর (রবিবার) শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যৌথ পূর্ণদিবস কর্মবিরতি এবং ২২ সেপ্টেম্বর থেকে যৌথ ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির ফলে বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাস কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
এদিকে গত বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টায় ৭ কর্মদিবসের মধ্যে দাবিসমূহ বাস্তবায়নের শর্তে চলমান ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করে রাবি অফিসার সমিতি। এদিন সমিতির সভাপতি মো. মোক্তার হোসেন ও কোষাধ্যক্ষ মো. মাসুদ রানা স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। তবে এদিন রাবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক মোঃ আব্দুল আলীম বলেন, এখনো প্রশাসনের কোনো আলোচনা হয়নি। দাবি আদায়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ চলবে।
অন্যদিকে চলমান ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে অচল হয়ে পড়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। শাটডাউন কর্মসূচির শুরুতেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস এবং পাশর্^বর্তী এলাকার ছাত্রবাস ছেড়ে বাড়ি চলে যান। ফলে শিক্ষার্থীশূন্য ক্যাম্পাসে ভোটারবিহীন রাকসু নির্বাচনের ঝুঁকি নেননি নির্বাচন কমিশন। গত ২২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জরুরী সভায় রাকসু নির্বাচন আগামী ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠানের নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর রাকসুর প্রার্থীরাও ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যান।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ আমীরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীবের সাথে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম নেতৃবেৃন্দর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপাচার্যের মৌখিক প্রতিশ্রুতি এবং রাকসু নির্বাচনী কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম চলমান শাটডাউন কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করেছে।’
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গত ২০ই সেপ্টেম্বর অনাকাঙ্খিত ঘটনার বিষয়ে দ্রুততম সময়ে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন। যদি দ্রুততম সময়ে দোষীদের শাস্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত না করা হয়, সেক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম সাধারণ শিক্ষকদের নিয়ে স্থগিতকৃত কর্মসূচি পুনরায় গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।’
যদিও গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকালেই রাকসুতে সক্রিয় অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়ে ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছিল রাবি’র জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পরিষদ’। জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের কমপ্লিট শাটডাউনের মধ্যেই এই সংগঠনের কতিপয় শিক্ষক ক্লাস-পরীক্ষা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে রাবি শাখা জামায়াতে ইসলামীর আমীর অধ্যাপক মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘উপ-উপাচার্যকে হেনস্তার বিচার দাবিতে আমরা একদিন কর্মবিরতি পালন করেছি। এই ঘটনার প্রতিবাদে আমরা মানববন্ধনেও ছিলাম। বিএনপিপন্থি শিক্ষকেরা আমাদের কথা দিয়েছিলেন, রাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করতে তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য চলমান কর্মবিরতি প্রত্যাহার করবেন। তবে তারা সেটি না করে, শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেছেন। তাদের এই কর্মসূচিতে আমাদের সংহতি নেই। গত সোমবার বিকালে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে কর্মবিরতি কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে। আমাদের শিক্ষকেরা রুটিন অনুসারে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।’
রাবি’র জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক আখতার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বুধবারই কাজে ফিরেছেন। ফলে দাপ্তরিক কার্যক্রম সচল হয়েছে। ইতোমধ্যে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন রাকসু নির্বাচন উপলক্ষ্যে ঘোষিত ২৩, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বরের ঘোষিত ছুটি প্রত্যাহার করেছে।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় সচল রাখার জন্য একটা বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। সবার সম্মিলিত প্রয়াস থাকলে সমাধান আসবে। রাকসু নির্বাচনের আগেই সবসমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবো। সব ধরনের প্রয়াস চলছে।’
নির্বাচন কমিশন জানায়, দুর্গাপুজার ছুটি শেষে বিশ^বিদ্যালয় খুললে রাকসু নির্বাচনের নতুন আচরণবিধি কার্যকর হবে এবং আগামী ১৬ অক্টোবর রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
উল্লেখ্য, একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসারে দুর্গাপুজা উপলক্ষ্যে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত ক্লাসসমূহ এবং ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত অফিসসমূহ ছুটি থাকবে। ক্যাম্পাসের সূত্রগুলো বলছে, শাটডাউন কর্মসূচির কারণে এবার ছুটি শুরুর আগেই, ছুটি হয়েছে রাবি।’



