ইনুর বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ, ৮ অভিযোগ আমলে নিল ট্রাইব্যুনাল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হয়েছে। সুনিদ্দিষ্ট আটটি অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই ফরমাল চার্জ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। অভিযোগ আমলে নিয়ে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর ইনুকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নের্তৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। ফরমাল চার্জ উপস্থান করেন প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহম্মেদ, সাইমুম রেজা তালুকদার, আবদুল্লাহ আল নোমান।
ইনুর বিরুদ্ধে ৮ অভিযোগ:
১৪ দলীয় জোটের শরীক দল জাসদের প্রধান হিসেবে ইনু উর্দ্ধতন অবস্থানে থেকে গত বছরের ১৮ জুলাই ভারতের মুম্বাই ভিত্তিক গণমাধ্যম ‘মিরর নাও’ এ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক ট্যাগ প্রদান করে এবং তাদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের উস্কানি প্রদান করেন। ১৯ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের সভায় আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি এবং “শ্যুট অ্যাট সাইট” সিদ্ধান্ত গ্রহন করে সরকার। ইনু সরকারের অংশীদার হিসেবে তার উর্ধ্বতন অবস্থান থেকে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে উক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহন ও বাস্তবায়নের নির্দেশ, প্ররোচনা, উস্কানি দিয়েছেন এবং সহায়তা করেছেন। ২০ জুলাই তার নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন দিয়ে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা প্রণয়ন ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দিয়ে পূর্বের নির্যাতনকে অনুমোদন করেন। নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ সুপার তার অধীনস্ত পুলিশ বাহিনী এবং ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের উপর গুলি বর্ষন করে ৭ জনকে হত্যা করে।
এছাড়া ইনু সার্বক্ষনিক শেখ হাসিনার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ঘেরাও করে ছত্রীসেনা নামিয়ে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে তাদেরকে গুলি ও বোম্বিং করে হত্যা, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উস্কানি প্রদান করেন। এরই অংশ হিসেবে ২০ জুলাই আন্দোলন দমনের এসব পদ্ধতি অনুমোদন করেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার সাথে টেলিফোনে উক্ত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। ২৭ জুলাই ইনু নিউজ-২৪ চ্যানেলে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক ট্যাগ প্রদান করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। সেই সাথে সরকার কর্তৃক কারফিউ জারিপূর্বক প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাকান্ড সংঘটনসহ নির্যাতন নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করেন।
২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইনু উপস্থিত থেকে আন্দোলনকে দমন ও ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক ট্যাগ প্রদান করে। তিনি জামায়াত ইসলামী’কে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের মাধ্যমে বাস্তবায়নে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানি দিয়ে এবং সহায়তা করার মাধ্যমে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডার কর্তৃক পরিচালিত হত্যাকান্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দেয়। ইনু সার্বক্ষনিক শেখ হাসিনার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি করে দেখা মাত্র গুলি করে হত্যা, প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার করে আন্দোলন দমনে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে জঙ্গি তকমা দিয়ে গুলি করে হত্যা, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উসকানি এবং নির্দেশ দিতে থাকেন। তারই অংশ হিসেবে ৪ আগস্ট সাড়ে ৪টার দিকে আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি করে গুলি বর্ষনসহ শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপ অনুমোদন করেন এবং তা কার্যকর করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সাথে টেলিফোনে উক্ত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সম্পৃক্ত ছিলেন তিনিএবং তার অধিনস্থ তার নিজ দলীয় নেতা কর্মীদের নির্দেশ প্রদান করেন।
‘মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচীর’ সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে গত বছরের ৫ আগস্ট সকাল ১০টায় কুষ্টিয়া শহরে জড়ো হতে থাকা ছাত্র জনতা অগ্রসর হতে গেলে ইনু, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাহবুবউল আলম হানিফ, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ সদর উদ্দিন খান ও সাধারণ সম্পাদক মো. আসগর আলী এবং শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো.আতাউর রহমানের নির্দেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসী অজয় সুরেখা, মানব চাকী, আতিকুর রহমান অনিক, শেখ হাফিজ চ্যালেঞ্জ, রাশিদুল ইসলাম বিপ্লব, তৈয়ব বাদশা, তাইজাল আলী খান, স্বপন কুমার পুলিশের ছত্র ছায়ায় (কোন কোন ক্ষেত্রে পুলিশের সাথে একত্রে) নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার উপর শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলি চালাতে থাকে। এই গুলি বর্ষনের ফলে সাতজন ঘটনাস্থলে মারা যায়।
চাঁনখারপুলে ৬ জনকে হত্যা:
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুলে গুলি করে ৬ জনকে হত্যা করে পুলিশ। এই ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বৃহস্পতিবার সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রসিকিউশনের ১৭ তম সাক্ষী কনস্টেবল আসিফ খান। বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নের্তৃত্বাধীন দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দি গ্রহনে ট্রাইব্যুনালকে সহায়তা করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, মো. মিজানুল ইসলাম, বিএম সুলতান মাহমুদ, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান। জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন আসামি পক্ষের কৌসুলিরা।
প্রসঙ্গত: এই মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ৮ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে হাবিবসহ ৪ আসামি পলাতক রয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন ইন্সপেক্টর আরশাদ, কনস্টেবল ইমাজ, নাসিরুল ও সুজন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments