অবশেষে ২৯ বছর আগে ঢাকাই সিনেমার দর্শকপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার (ইমন) ওরফে সালমান শাহ’র লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর রমনা থানায় এই হত্যা মামলাটি দায়ের করেন সালমান শাহ’র মামা মোহাম্মদ আলমগীর। মামলায় সালমান শাহ’র সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি পারলারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদসহ মোট ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।
এর আগে সালমানের মৃত্যু নিয়ে রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছিল। গত সোমবার ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস বাদীপক্ষের করা রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এই নায়ক মারা যান ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর।
সালমানের মা নীলা চৌধুরী বর্তমানে লন্ডনে আছেন। আদালতের নির্দেশ ও মামলার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘এখন একটাই চাওয়া- ছেলে হত্যার বিচার চাই।’ নীলা চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমার ছেলের মৃত্যুকে বারবার আত্মহত্যা বলে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আদালত রিভিশন মঞ্জুর করার মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে আমাদের অভিযোগই সঠিক। আমরা আদালতে এটি প্রমাণও করতে পারবো।’
আসামিরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে সরকারকে সে বিষয়টি নিশ্চিতের আহŸান জানিয়েছেন সালমানের মা। তিনি বলেন, প্রশাসনকে এখন বিষয়টি দেখতে হবে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মো.আবিদ হাসান বলেন, ‘সালমান শাহ’র অপমৃত্যু মামলার রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে আদালত বলেছেন, পূর্বের সকল তদন্ত রিপোর্ট ত্রæটিপূর্ণ ছিল। পিবিআইয়ের তদন্তও সঠিকভাবে করা হয়নি। করোনাকালীন সময়ে নারাজির শুনানিতে সালমান শাহ’র মা আসতে পারেননি। আদালত সেটিও আমলে নিয়েছেন। দীর্ঘ ২৯ বছর পর আদালত এ মামলাকে হত্যা মামলা হিসেবে রায় দিয়েছেন। অথচ এতোগুলো বছর ব্যয় করা হয়েছে শুধুমাত্র হত্যার আলামত নষ্ট করার জন্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, দীর্ঘ সময় তারা ভুল রিপোর্ট দিয়েছেন, সময়ক্ষেপণ করেছেন। আদালত এ মামলার আসামি সামিরা, ডন, আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।’
আইনজীবী আবিদ হাসান বলেন, ‘এ মামলায় তৎকালীন একজন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালত এটি পড়ে শুনিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত আসামি সকলেই এ মামলায় জড়িত ছিল। আদালত তাদের বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, সামিয়ার ব্যাগে লোকাল এনেস্থিসিয়া পাওয়া গেছে। যেটা মানুষ অজ্ঞান করার জন্য ব্যবহার করা হয়। এটা মাত্রাতিরিক্ত হলে মানুষ হৃদরোগে মারা যেতে পারে। আদালত বলেছে, সালামান শাহ’র বুকের ডান ও বাম পাশে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। যেটা কালো দাগ হিসেবে ছিল। যে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, সেটা অপমৃত্যু হতে পারে না। কোনও ব্যক্তি দ্বারা শক্ত কোনও আঘাত হতে পারে। পিবিআই, পুলিশ ও র্যাবের তদন্ত কর্মকর্তারা কোন কোন জায়গায় ভুল করেছে, অবহেলা ছিল, আদালত সেটি বলেছিলেন। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এই অবহেলার পেছনে কারও হাত ছিল। যারা এটি করিয়েছেন। তারা কার সঙ্গে কথা বলেছেন, কী কী বলেছেন। সেটার ছবিও আদালত আমাদের দেখিয়েছেন। সর্বশেষ আদালত অতিদ্রæত এ বিষয়ে তদন্ত করে রমনা থানাকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা আশাবাদী, এখন সঠিক তদন্ত হবে। আমরা ন্যায় বিচার পাবো।’
জানা গেছে, সালমান শাহর মৃত্যুতে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহের বাবা প্রয়াত কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী।
মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সালমানের বাসায় ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যান তার বাবা-মা। কিন্তু সালমানের ব্যক্তিগত সহকারী আবুল ও তার স্ত্রী সামিরা বলেন, ‘সালমান রাত জেগে কাজ করেছে। এখন তাকে ঘুম থেকে ডাকা যাবে না।’ তারা প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে বাসায় ফিরে আসেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেলিম নামের একজন ফোন করে জানান, সালমানের কী যেন হয়েছে। সালমানের বাবা, মা ও ভাই তাৎক্ষণিক বাসায় ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তারা সালমানের মরদেহ দেখতে পান।
কিন্তু মৃত্যুর এক বছর না যেতেই ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে এমন অভিযোগ এনে আদালতে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করার আবেদন জানান তিনি। ফলে সালমান শাহর মৃত্যু নতুন রহস্য ধারণ করে। মামলাটি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে ওই প্রতিবেদন গৃহীত হয়। কিন্তু সিআইডি’র প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী দায়রা আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি দ্বিতীয় দফায় বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত। প্রায় ১১ বছর মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে ছিল। ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট তৎকালীন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বিকাশ কুমার সাহার কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। এ প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০১৬ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন ঢাকার বিশেষ জজ-৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েস (বর্তমানে বিচারপতি) রাষ্ট্রপক্ষের রিভিশনটি মঞ্জুর করেন এবং র্যাব মামলাটি তদন্ত করতে পারবে না বলে আদেশ দেন। এরপর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। দীর্ঘ চার বছর আলোচিত এই মামলা তদন্ত করতে গিয়ে পিবিআই ৪৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছে। ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট আলামতও জব্দ করা হয়। তবে এই মামলার একজন সাক্ষীকে খুঁজে পায়নি পিবিআই।
২০২০ সালের ২৫ ফেব্রæয়ারি পিবিআই’র পরিদর্শক সিরাজুল সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন মর্মে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পিবিআই। সালমান শাহর মৃত্যুতে ৫টি কারণ খুঁজে পায় তদন্ত সংস্থাটি। কারণগুলো হলো, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে সালমানের অতিরিক্ত অন্তরঙ্গতা, স্ত্রী সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ, মাত্রাধিক আবেগপ্রবণতার কারণে একাধিকবার আত্মঘাতী হওয়ার বা আত্মহত্যার চেষ্টা, মায়ের প্রতি অসীম ভালোবাসায় জটিল সম্পর্কের বেড়াজালে পড়ে পুঞ্জীভ‚ত অভিমানে রূপ নেওয়া এবং সন্তান না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে অপূর্ণতা।
পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদের আদালত ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত পিবিআইর দেওয়া প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন। এরপর আবার সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক কেএম ইমরুল কায়েশ রিভিশন আবেদন গ্রহণ করেন। মামলাটি বর্তমানে রিভিশন শুনানির পর্যায়ে রয়েছে।



