নতুন প্রতীক তালিকায় ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য প্রতীকের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে শাপলা কলিসহ বেশ কিছু প্রতীক সংযোজন ও বিয়োজন করা হয়েছে। এর আগে কয়েকদফা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে শাপলা প্রতীক পেতে বৈঠক করে জুলাই-আগস্ট গণভ্যুত্থানের নেতৃত্বে দেয়া ছাত্রদের গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এছাড়া দলটির পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছিল ‘শাপলা’ না দিলে তারা নিবন্ধন নেবে না। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করা হলো প্রতীকের তালিকায়। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, ‘আমরা বরাবরই বলে আসছি, এনসিপি শাপলা চায়। এনসিপি শাপলা নিয়ে নির্বাচন করবে। শাপলার প্রশ্নে আমরা আপসহীন। শাপলা নিয়ে আমরা একবিন্দু ছাড় দিতে চাই না।’
গতকাল বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত এস.আর.ও. নং ৪৩১-আইন/২০২৫ অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, ২০০৮’এর সংশোধনের মাধ্যমে প্রতীক তালিকায় নতুন সংযোজন করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, ২০০৮এর বিধি ৯-এর উপবিধি (১) সংশোধন করে প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীদের জন্য প্রাপ্য প্রতীক তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। এই তালিকায় ১ নম্বর থেকে ১১৯ নম্বর পর্যন্ত মোট ১১৯টি প্রতীক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে নতুন সংযোজন হিসেবে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক যুক্ত হয়েছে ১০২ নম্বরে- যা এবার থেকে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে বরাদ্দ দেওয়া যাবে।
গেজেটের ভাষ্যমতে, স্থগিত প্রতীক ছাড়া অন্য সব প্রতীক প্রার্থীদের প্রাপ্যতা অনুসারে বরাদ্দ দেওয়া যাবে। প্রতীকগুলোর মধ্যে রয়েছে আপেল, আম, একতারা, ঘোড়া, টেলিভিশন, নৌকা, ধানের শীষ, রেল ইঞ্জিন, বাইসাইকেল, হাতি, সূর্যমুখীসহ জনপ্রিয় প্রতীকগুলো। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগের ২৪ সেপ্টেম্বর জারি করা এস.আর.ও. নং ৩৮১-আইন/২০২৫ বাতিল করা হয়েছে এবং নতুন সংশোধিত তালিকাটি কার্যকর করা হয়েছে।
ইসি সচিবালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, প্রতীক তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে নির্বাচনি পরিবেশ আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে। এতে নিবন্ধিত দলগুলোর অনুরোধ ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করা হয়েছে।
এনসিপি দলের মার্কা শাপলা করতে চেয়েছিল’ উলেখ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহŸায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, কিন্তু গেজেটভুক্ত হয়েছে ‘শাপলা কলি’। এটি করে ইসি এনসিপির ওপর একটি মনস্তাত্তি¡ক চাপ তৈরি করতে চাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। সামান্তা বলেন, নির্বাচন কমিশন কোনো ধরনের কারণ, আইনি ব্যাখ্যা, কোনো সাংবিধানিক ব্যাখ্যা ছাড়া এটি করেছে। এই নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কারও দাবিতে নয়, ইসি মনে করেছে তাই ‘শাপলা কলি’: সচিব
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তফসিলভুক্ত প্রতীকের তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে ‘শাপলা কলি’। প্রতীকটি যুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করেছে ইসি। এর আগে ‘শাপলা’ প্রতীক নিয়ে ৪ মাস ৯ দিন ধরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে টানাপোড়েন চলছিল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির। এখন এনসিপির ‘চাপে’ তফসিলে ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করা হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, ‘শাপলা’ আর ‘শাপলা কলি’-র মধ্যে পার্থক্য আছে। এটা ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে ইসির সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
কোনও দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রতীক যুক্ত করা হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে আখতার আহমেদ বলেন, ‘এখন আপনি যেটা বলছেন যে “শাপলা কলি রাখা হয়েছে কেন” নতুন যে প্রতীকগুলো ভেতরে আসছে, সেখানে শাপলা কলি রাখা হয়েছে। এটা ইলেকশন কমিশন মনে করেছে যে শাপলা কলিটা রাখা যেতে পারে। এটা কারও দাবির প্রাসঙ্গিক বিষয় নয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালার তফসিলটা সংশোধন করেছি। কিছু কিছু প্রতীক নিয়ে কিছু মন্তব্য আমরা শুনেছি-যেমন কেউ বলেছে, এটা রাখলেন কেন, না রাখলে ভালো হতো, রাখা কি যৌক্তিক হয়েছে কি-না ইত্যাদি। এই বিবেচনায়, আগে যে ১১৫টা প্রতীক ছিল, তার থেকে আমরা ১৬টা প্রতীক বাদ দিয়ে নতুন করে প্রতীক নিয়ে ১১৯টা প্রতীক এবার শিডিউল করেছি।’
এদিকে গত ২২ জুন রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের আবেদন করে ‘শাপলা’ প্রতীক চেয়েছিল এনসিপি। তবে ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয় দলটিকে এ প্রতীক না দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময় ইসির পক্ষ থেকে বলা হয় তফসিলে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় ‘শাপলা’ প্রতীক পাবে না এনসিপি। নতুন করে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক কেন যুক্ত করা হলো-এমন আরেক এক প্রশ্নের জবাবে ইসির সিনিয়র সচিব বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি কিছু কিছু প্রতীক সম্পর্কে বিরূপ মতামত আমাদের কানে এসেছে। কমিশন মনে করেছে, এটা সংশোধন করা দরকার বা করা যেতে পারে। সেই বিবেচনায় এটা করা হয়েছে। যেহেতু বিরূপ কিছু সমালোচনা এসেছিল, সেই জন্য কিছু বাদ দিয়ে কিছু নতুন যোগ করা হয়েছে। কিছু বিয়োজন, কিছু সংযোজন।’
তিনি বলেন, ‘আজ যেমন করা হয়েছে, ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আবার সংশোধন করবে। এটা কোনও স্থির আইন নয়। তর্ক-বিতর্ক উঠলেই কমিশন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেউ যদি বলে কমিশন চাপে পড়ে এটা করেছে…. না, কমিশন নিজের বিবেচনায় করেছে। এখানে নতুন করে বিতর্কের কিছু দেখছি না। বরং কমিশন আবার প্রমাণ করল যে কমিশন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান।’



