‘রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আব্দুর রহমানের স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসীর (৪৪) নিকট থেকে টাকা নিতেন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য লিমন মিয়া (৩৫)। টাকা দেওয়া বন্ধ করার কারণে বাসায় গিয়ে বিচারকের স্ত্রীর ওপর ধারালো ছুরি নিয়ে হামলা চালায় ঘাতক লিমন। এসময় ছেলে তাওসিফ রহমান সুমন (১৬) মাকে রক্ষায় এগিয়ে আসলে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে রাজশাহী মেট্টোপলিটন পুলিশ (আরএমপি)।’ বৃহস্পতিবার রাতে আরএমপির মুখপাত্র মোঃ গাজীউর রহমানের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
রামেক মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত
এদিকে শুক্রবার সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) ও হাসপাতালের মর্গে নিহত বিচারক পুত্র তাওসিফ রহমান সুমনের লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। রামেক ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক কফিল উদ্দিন এবং প্রভাষক শারমিন সোবহান কাবেরী প্রায় আধাঘন্টা ধরে লাশের ময়নাতদন্ত করেন। এ সময় বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন তাওসিফের বাবা বিচারক আব্দুর রহমান। ময়নাতদন্ত শেষে ডা. কফিল উদ্দিন বিচারকের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
ডা. কফিল উদ্দিন বলেন, ‘অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তাওসিফ রহমান সুমনের মৃত্যু হয়েছে। তাওসিফের শরীরে তিনটি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এগুলো হলো- ডান ঊরু, ডান পা ও বাঁম বাহু। এসব ধারালো ও চোখা অস্ত্রের আঘাতের জায়গায় থাকা রক্তনালি কেটে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। এসব আঘাতের কারণে তার শরীরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণও হয়েছিল। আমরা মনে করছি, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।’ অন্যদিকে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে ভিকটিমের গলায় কালশিরা দাগের উল্লেখ প্রসঙ্গে এই চিকিৎসক বলেন, ‘নরম কাপড় দিয়ে শ্বাসরোধের কারণে দাগটি হতে পারে। তবে তা ভিকটিমের মৃত্যুর প্রধান কারণ নয়। ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা একই সময়ে হয়েছে’ বলে জানান তিনি।
জামালপুরের পথে বিচারকপুত্রের লাশ
শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় রামেক হাসপাতাল মর্গ থেকে তাওসিফের লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলার চকপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন স্বজনরা। এর আগে রামেক মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলে মর্গের ভেতরে গিয়ে ছেলের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিচারক আব্দুর রহমান। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন রাজশাহী সেন্টারের পরিচালক মো. কায়সার পারভেজ মেহেদী জানান, সংস্থার সদস্যরা মর্গের নির্ধারিত কক্ষে লাশের গোসল করিয়ে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে গেছেন।
আরএমপি কি বলছে
আরএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার লিমন মিয়ার (৩৫) সঙ্গে জজের স্ত্রীর পূর্ব পরিচয় ছিল। এর সূত্র ধরে বিভিন্ন সময় লিমন আর্থিক সহায়তা নিতেন। একপর্যায়ে জজের স্ত্রী টাকা দেওয়া বন্ধ করলে লিমন মিয়া বিভিন্নভাবে তাকে বø্যাকমেইল করা শুরু করেন। বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে লিমন রাজশাহী শহরের ডাবতলা এলাকায় জজের ভাড়া বাসায় যান।’
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘লিমন তাসমিন নাহারের ছোট ভাই পরিচয় দিয়ে বাসায় ঢুকে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে চাকু বের করেন। তখন জজের স্ত্রী প্রাণভয়ে দৌড়ে রুমের ভিতর ঢুকে দরজা আটকে দেন। এ সময় লিমন দরজা লাথি দিয়ে ভেঙে ভেতরে ঢুকেন। তখন জজের ছেলে তাওসিফ তার মাকে রক্ষার জন্য ঘরে ঢোকে। একপর্যায়ে লিমন জজের স্ত্রী এবং ছেলেকে ছুরিকাঘাত করেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে লিমনও আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাওসিফকে মৃত ঘোষণা করেন।’ পুলিশ জানায়, ‘হামলাকারী ব্যক্তিকে পুলিশ পাহারায় রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট রাজপাড়া থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। তবে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি।
সিলেটে গণপিটুনির শিকার লিমন
বিচারকের স্ত্রী, তার মেয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) শিক্ষার্থীর সিলেটের নয়াবাজার খাদরার ভাড়া বাসা গেলে সেখানে গিয়েও এই লিমন তাদের উত্যক্ত করে গণপিটুনির শিকার হন। এসএমপি’র একজন পরিদর্শক জানান, ৫ নভেম্বর রাতে লিমন বিচারকের স্ত্রী-মেয়েকে উত্যক্ত করলে স্থানীয়রা তাকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দেন। তবে ওইদিন বিচারকের স্বজনেরা থানায় অভিযোগ দেননি। ঘটনাটি বিচারককেও জানাননি। পুলিশ অভিযুক্তকে এসএমপি আইনের ৮৯ ধারায় কোর্টে চালান করলে পরদিন পরিবারের সদস্যরা জামিনে মুক্ত করেন। শাবির প্রক্টর অধ্যাপক মুখলেসুর রহমান ওই রাতের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
লিমন মিয়া বিএনপি নেতার ছেলে
ঘাতক লিমনের বাড়ি গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার মদনপাড়া ভবানীগঞ্জ গ্রামে। প্রতিবেশী রাজু মিয়া বলেন, সাবেক ইউপি মেম্বার এএইচএম সলেমান শহীদের তৃতীয় ছেলে এই লিমন। সলেমান শহীদ ফুলছড়ি উপজেলা বিএনপির সাংগনিক সম্পাদক। বাবা-ছেলে উভয়ে সেনা সসদস্য ছিলেন। কয়েক বছর আগে লিমনের চাকরি চলে যায়। এরপর সে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিয়েও করেছিল, কিন্তু বউ চলে যায়। লিমনের বাবা এইচএম সোলাইমান শহিদ জানান, চার বছর আগে লিমন স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীর চাকরি ইস্তেফা দেয়। কিছুদিন পর রাজশাহীতে ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা করত। পরিবারে তার যোগাযোগ ছিল না। ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউপি’র প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আজাদ মিয়া বলেন, আমি জানি সোলাইমান ভাইয়ের ছেলে সেনাবাহিনীতে আছে। সোলাইমান ভাইও সেনাবাহিনীতে ছিলেন। তবে ছেলের ব্যাপারে বেশি কিছু জানি না।
বিচারকের স্ত্রী জিডিতে যা বলেন
গত ৬ নভেম্বর সিলেটের জালাবাদ থানায় লিমনের বিরুদ্ধে জিডি করেন বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসী। জিডিতে বলা হয়, ‘আর্থিক সহযোগিতায় অপারগতা প্রকাশ করায় ফোন করে লিমন নানারকম হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। সর্বশেষ ৩ নভেম্বর সকালে লিমন মেয়ের ফেসবুক মেসেঞ্জারে কল করে আমাকে ও পরিবারের লোকজনদের হত্যা করবে বলে হুমকি দেয়। লিমন যেকোনো সময় আমিসহ পরিবারের সদস্যদের বড়ধরনের ক্ষতিসাধন করতে পারে বলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’
জালালাবাদ থানার উপ-পরির্দশক (এস.আই) প্রণব রায় বলেন, ‘জিডির আগে লিমন বিচারকের স্ত্রী ও মেয়েকে উত্ত্যক্ত করেছিল। ওই রাতে আমি ডিউটিতে ছিলাম। পরে আমরা তাকে ধরে কোর্টে চালান করি। পরদিন ম্যাডাম থানায় জিডি করেন। লিমন কখন জামিনে বেরিয়ে রাজশাহী গেছে, আমরা বলতে পারবো না।’ জালালাবাদ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহ মোহাম্মদ মোবাশ্বির বলেন, ‘বিচারক আব্দুর রহমানের মেয়ে বিবাহিত। বিচারকের স্ত্রী সিলেটে মেয়ের বাসায় আসেন। সেখানে গিয়ে লিমন তাকে উত্যক্ত করে। এছাড়া হুমকির পর তিনি থানায় জিডি করেন।’
ভবনের দারোয়ান যা বলেন
স্পার্ক ভিউয়ের ভবনের দারোয়ান মেসের আলী বলেন, লিমনকে আগে কখনো দেখিনি। বিচারককে ভাই পরিচয় দেয়ায় খাতায় নাম ও মোবাইল নম্বর লিখিয়ে আড়াইটায় সে ব্যাগ হাতে ফ্ল্যাটে যায়। প্রায় ৩০ মিনিট পর গৃহকর্মী এসে জানায়, ফ্ল্যাটে বিচারকের ছেলে ও স্ত্রীকে কুপিয়ে আহত করেছে। অন্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা ফ্ল্যাটে এসে তিনজনকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
রমেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, বিচারকের স্ত্রীর ডান হাত, উরু ও বাম বাহুতে গুরুতর জখম রয়েছে। এছাড়া তার ডান হাতের একটি রগ কেটে গেছে। চিকিৎসকদের একটি সমন্বিত দল অস্ত্রোপচার করেছেন। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তিনি জানান, ঘাতক লিমন মিয়ার ডান হাতে জখম ছিল। তবে সেটি গুরুতর নয়।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরীর তেরখাদিয়া ডাবতলার ‘স্পার্কভিউ’ ভবনের পাঁচতলার ফ্ল্যাটে বিচারকের ছেলে ও রাজশাহী গভ. ল্যাবরেটরী স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাওসিফ রহমান সুমন খুন হয়।



