বাগমারায় ৯৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ১৮ সমবায় সমিতি

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার একডালা গ্রামের খোদেজা বেগম (৫৬) বহু বছর ধরে মানুষের বাসায় কাজ করে ও হাঁস-মুরগি পালন করে চার লাখ টাকা জমিয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল-একটি পাকা ঘর করবেন, শেষ বয়সে শান্তিতে থাকবেন। কিন্তু চার লাখ টাকা দিয়ে ঘর হবে না, আরও কিছু লাগবে-এই ভেবে স্থানীয় একটি সমিতিতে টাকাগুলো আমানত হিসেবে রাখেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, মেয়াদ শেষে টাকাটা দ্বিগুণ হবে। কিন্তু মেয়াদের আগেই ওই সমিতির লোকজন সব টাকা-পয়সা নিয়ে গা-ঢাকা দেন।

খোদেজা বেগমের মতো এমন আরও প্রায় ২ হাজার ৩০০ গ্রাহকের আমানতের প্রায় ৯৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে বাগমারার ১৮টি সমিতি। মামলা, অভিযোগ, বিক্ষোভ, মিছিল-সব চেষ্টা করেও টাকা ফেরত পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা।

শাহানাজ নামে স্থানীয় এক নারী বলেন, তিনি ও তাঁর স্বজনেরা মিলে ম্যাসেঞ্জার সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতি নামে একটি সমিতিতে ৩৩ লাখ টাকা রেখেছিলেন। এর মধ্যে এক স্বজনের (চাচি) অবসরের টাকা আছে। আগে যে মুনাফা দিতো, তা দিয়ে সংসার চলতো। এখন মুনাফা বা আমানতের টাকা ফেরত না দিয়ে সমিতির কর্মকর্তারা উধাও হয়েছেন। থানায় অভিযোগ দিলেও কাজ হয়নি।

উপজেলা সমবায় দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাগমারায় বিভিন্ন সময় নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে ৩০৩টি সমবায় সমিতিকে। কিন্তু গ্রাহকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুই দফায় ৬৮টি সমিতির নিবন্ধন বাতিল করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১০০টি সমিতিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

২০১৮ সালের পর থেকে সমিতির নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় এক শ্রেণির ব্যক্তি সুযোগ গ্রহণ করে আমানত সংগ্রহ করেন। উপজেলা সমবায় দপ্তরের সহকারী পরিদর্শক তাসনিমুল হক জানান, পাইলট প্রকল্প হিসেবে উপজেলা সমবায় দপ্তর থেকে ২০১৯ সাল হতে সমিতির নিবন্ধন দেওয়া হয়। অনিয়মের অভিযোগ আসা সমিতির অধিকাংশই সেসময় নিবন্ধন লাভ করে। তবে দুই বছর পর নিবন্ধনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় ওই পাইলট প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, এসব সমিতির লোকেরা শুরুতে বেশি মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে আমানত সংগ্রহ করতেন। কেউ বাৎসরিক, কেউ মাসিক, কেউ ত্রৈমাসিক মুনাফা দেওয়ার কথা বলতেন। আবার কোনো কোনো সমিতি পাঁচ বছরে দ্বিগুণ মুনাফার প্রলোভন দিত। মাসে প্রতি লাখে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা এবং বছরে প্রতি লাখে ২০ হাজার টাকা মুনাফা দেওয়ার প্রতিশ্রæতি দিয়ে অনেকেই আমানত রাখেন। কৃষক, শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, শ্রমিক-সব শ্রেণির মানুষ তাঁদের সঞ্চয় জমা দেন এসব সমিতিতে। গ্রাহকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সমিতি ২৮ লাখ টাকা থেকে শুরু করে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে।

গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুতে নিয়মিত মুনাফা দেওয়া হলেও চলতি বছর থেকে টালবাহানা শুরু করে সমিতিগুলো। এরপর একে একে ১৮টি সমিতির পরিচালকেরা অফিস গুটিয়ে উধাও হয়ে যান। এখনো সাইনবোর্ড ঝুললেও নেই কোনো কর্মী, নেই টাকা ফেরতের আশ্বাসও। এসব সমিতির মধ্যে আছে আত তিজারা, আলোর বাংলা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমিতি, আল-বায়া সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড, তোরা ফাউন্ডেশন, মোহনা সমাজ কল্যাণ সংস্থা, স্বচ্ছতা গ্রাম উন্নয়ন সমিতি, আঁত তাঁবারা শিক্ষক কল্যাণ সমিতি, আল আকসা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমিতি, আমেনা ফাউন্ডেশন, নদী সঞ্চয় ঋণদান সমিতি, চানপাড়া সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা, সাফল্য গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা, সোনালী সকাল ঋণদান সমিতি, সালেমা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমিতি, ম্যাসেঞ্জার সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতি, জনপ্রিয় সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতি, গোল্ডেন স্টার সমিতি, অগ্রণী সমবায় সমিতি এবং স্বনির্ভর সঞ্চয় ঋণদান সমিতি।

আলোর বাংলা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমিতির গ্রাহক কমিটির সভাপতি মজনুর রহমান জানান, এই সমিতির তিনটি শাখা থেকে পরিচালক ৪৫০ জন গ্রাহকের ২৩ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন বলে তাঁদের কাছে তথ্য আছে।

অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা বীরেন্দ্রনাথ সরকার জানান, তিনি মোহনা নামের একটি সমিতিতে নয় লাখ টাকা রেখেছিলেন। টাকা ফেরত না পাওয়ায় প্রায় ২০ জন গ্রাহক মিলে মামলা করেছেন। পরিচালক মুরাদ হোসেন গ্রেপ্তার হলেও জামিন নিয়ে পরে লাপাত্তা হয়েছেন।

আল বায়া সমিতির আমানতকারীদের নেতা ভবানীগঞ্জের বাসিন্দা মাহাবুর রহমান বলেন, তিনিসহ ৭০ জন গ্রাহক প্রায় চার কোটি টাকা আমানত রেখেছিলেন। আমানতের টাকা ফেরত না পেয়ে তিনিসহ ২০ জন মিলে মামলা করেছেন। পুলিশ সমিতির দুই পরিচালককে গ্রেপ্তার করেছে।

রইচ উদ্দিন নামের একজন দলিল লেখক বলেন, তিনি আঁত তাঁবারা নামের একটি সমিতিতে ১০ লাখ টাকা আমানত রেখেছিলেন। এক মাস আগে সমিতির পরিচালক তাঁরসহ ২০০ জনের আমানতের প্রায় ২৮ কোটি টাকা নিয়ে দেশের বাইরে চলে গেছেন। এর প্রতিবাদে ও টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে স্মারকলিপি দিয়েছেন।

অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারি কর্মচারী বলেন, তিনি আঁত তিজারা সমিতিতে ১০ লাখ টাকা আমানত রেখেছেন। এখন মুনাফা দিচ্ছে না, আমানতের টাকা চাইলেও পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবার ও নিজের চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারছেন না।

পালিয়ে থাকা চার পরিচালকের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তাঁরা স্বীকার করেন, আমানত নিজেদের কাছে আছে এবং ফেরত দিতে না পারার কথা জানান। আলোর বাংলা ফাউন্ডেশনের আজিজুল হক বলেন, ‘মাঠে কিছু টাকা আছে এবং সম্পদ আছে। একটু সময় দিলে ফেরত দেওয়া হবে।’ সুমন আহম্মেদ নামে আরেক পরিচালকও একই কথা বলেন। কারাবন্দী এক পরিচালক আক্কাছ আলী গ্রেপ্তারের আগে এবং আত্মগোপনে থাকা মুরাদ হোসেন নামে এক পরিচালক বলেন, গ্রাহকের টাকায় ব্যবসা করে লোকসান হয়েছে।

সমবায় দপ্তর এসব প্রতারণা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে কি না-এ প্রশ্নে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা কাউসার আলী বলেন, পরিচালকদের দেওয়া তথ্যে বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি হয়। সমিতিগুলো কৌশলে একাধিক সংস্থা থেকে অনুমতি নিয়ে আমানত সংগ্রহ করেছে।

বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, এসব ঘটনায় কয়েকটি মামলা হয়েছে। পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে। প্রতিনিয়তই অভিযোগ আসে।

বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল ইসলাম বলেন, এসব সমিতির আমানত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সমবায় নীতি মানা হয়নি। আইনগত বিষয় দেখে সমিতিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments