দেশে সরকারিভাবে আমদানিকৃত ফার্নেস অয়েল বাজার দরের চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বিক্রি করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। এর ফলে গত ছয় মাসে ফার্নেস তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রায় ৬০২ কোটি বেশি খরচ করেছে। আর কেন্দ্রগুলোর এ অতিরিক্ত জ্বালানি খরচের কারণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সমপরিমাণ লোকসান করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ফার্নেসের মূল্যহার আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে নির্ধারণ করতে আহবান জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
গত সপ্তাহে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে পাঠানো এক চিঠি সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিপিসির সরবরাহকৃত ফার্নেস অয়েলের (এইচএফও) উচ্চমূল্যের কারণে পিডিবি ৬০২ কোটি টাকা বেশি লোকসান করেছে। ফার্নেস তেলের উচ্চমূল্যের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। তাই বাজারভিত্তিক মূল্যহার নির্ধারণের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ আহবান করেছে।
গত বছরের অক্টোবরের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিপিসি সরবরাহ করা এইচএফওর দাম ছিল লিটার প্রতি প্রায় ৮৬ টাকা, যেখানে বেসরকারিভাবে আমদানি করা এইচএফও পাওয়া গেছে লিটার প্রতি প্রায় ৬৬ টাকায়। এই মূল্য পার্থক্যের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে।
চিঠিতে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর- ছয় মাসে বিপিসির এবং বেসরকারিভাবে কেনা ফার্নেস অয়েলের দামের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছে জ্বালানি বিভাগ। তাতে দেখা প্রতি মাসেই বেসরকারিভাবে আমদানিকৃত তেলের চেয়ে বিপিসির তেলের দাম বেশি।
বেসরকারিভাবে আমদানিকৃত ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করলে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি খরচ পড়ে প্রায় ১৩ টাকা ৯২ পয়সা। অথচ বিপিসি সরবরাহকৃত এইচএফও ব্যবহারে একই খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ টাকা ১০ পয়সায়। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে ৫ টাকা ১৮ পয়সা।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) আওতায় পরিচালিত অনেক তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি ব্যয় পুরোপুরি পিডিবির ওপর বর্তায়। ফলে বিপিসির উচ্চমূল্যের ফার্নেস তেল সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও পিডিবির লোকসান বাড়াচ্ছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২ আগস্ট ফার্নেস তেলের দর সমন্বয় করেছিল বিপিসি।
বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, শুধু এই ট্যারিফ পার্থক্যের কারণেই চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে ৬০২ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। আগের অর্থবছরেও একই কারণে লোকসানের পরিমাণ ছিল ১৩৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, এইচএফওর দাম বাজারভিত্তিক না হলে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়তে পারে।
এদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট ও কয়লা আমদানিতে বিলম্বের কারণে আসন্ন বোরো সেচ মৌসুমে (এপ্রিল-মে ২০২৬) অন্তত ৩ হাজার ২১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ফার্নেস তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে পিডিবি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি মিলিয়ে ৩৮টি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৪ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, ফার্নেস তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো এমনিতেই ব্যয়বহুল। এর ওপর জ্বালানির দাম বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি হলে বিদ্যুতের বাল্ক সরবরাহ ব্যয় আরও বাড়ে এবং সরকারের ভর্তুকির বোঝা ভারী হয়।
উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা পর্যায়ের নির্ধারিত মূল্যহারের ব্যবধান সামাল দিতে পিডিবিকে নিয়মিত বাজেট সহায়তা নিতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোই লোকসানের অন্যতম প্রধান উৎস।
এইচএফওর মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি গত ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিপিসির এইচএফও ট্যারিফ সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
চিঠিতে বিদ্যুৎ বিভাগ উল্লেখ করে, বাজারভিত্তিক এইচএফও মূল্য নির্ধারণ করা হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি উভয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ব্যয় কমবে। এতে বিপিডিবির লোকসান হ্রাস পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের ট্যারিফ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ১৫ মাস পর ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এ লক্ষ্যে আগামী ২৯ জানুয়ারি গণশুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিইআরসি জানিয়েছে, শুনানিতে অংশ নিতে আগ্রহী অংশীজনদের ২২ জানুয়ারির মধ্যে লিখিত আবেদন জমা দিতে হবে। কমিশনের শুনানি কক্ষে এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
ডিজেলের পর ফার্নেস অয়েলই দেশে দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত জ্বালানি তেল, যার সবচেয়ে বড় গ্রাহক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ উৎপাদিত হয়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে এবং বাকি ৬৫ দশমিক ১৪ শতাংশ আমদানি করা হয়েছে।



