গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, বৈষম্য দূরীকরণ এবং সব ধর্ম ও গোষ্ঠীর মানুষের সমান অধিকারের পক্ষে কাজ করাই সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র। যে সমাজে সাংবাদিকতা শক্তিশালী ও স্বাধীন, সে সমাজে গণতন্ত্র সুদৃঢ় হয় এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। গণমাধ্যম যদি উচ্চকণ্ঠ না থাকে, তাহলে সমাজে অনেক ধরনের অপরাধ ছড়িয়ে পড়ে। বিভেদ ভুলে ব্যক্তিপূজা পরিহার করে দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকাটা জরুরি। একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতাই নির্ভয়ে সরকারকে সত্য কথা বলতে পারে।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদ যৌথভাবে আয়োজিত মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সংগঠিত হামলার প্রতিবাদ এবং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে আয়োজিত গণমাধ্যম সম্মিলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, যায়যায়দিন সম্পাদক সাংবাদিক শফিক রেহমান, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন,
চট্টগ্রামভিত্তিক দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের (বিজেসি) সভাপতি ও মাছরাঙা টিভির প্রধান সম্পাদক রেজওয়ানুল হক, বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের শহীদুল ইসলাম, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মুনীমা সুলতানা, দৈনিক করতোয়ার সম্পাদক মোজাম্মেল হক, রংপুরের যুগের আলোর সম্পাদক মমতাজ শিরিন, সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান হান্নান, গৌরাঙ্গ দেবনাথ অপু, মোশতাক রহমান, একরামুদৌলাসহ অন্যরা।
স্বাগত বক্তব্য দেন নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর। এ ছাড়া সম্মিলনে অংশ নেন নোয়াব ও সম্পাদক পরিষদের সব সদস্য, অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার, জাতীয় প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ডিপ্লোমেটিক করেসপনডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম, ফটো জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা এবং ঢাকার বাইরে কর্মরত সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের সম্পাদক-প্রকাশকরা।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আয়োজনে গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রদর্শন করা হয় একটি ডকুমেন্টারি।

স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করলে, সত্যিকার অর্থে সেই উদারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি রাখলে সরকারই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে এমন মন্তব্য করে দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুনভাবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং জবাবদিহিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করার সময় এসেছে। একইভাবে সাংবাদিকতার একটা নতুন গণতান্ত্রিক, বলিষ্ঠ ন্যায়পরায়ণ, এথিক্যাল জার্নালিজম করারও একটা সময় এসছে। সে জন্য সবাইকে একসঙ্গে সাংবাদিকতা পেশাকে আরও বেশি জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য কাজ করতে হবে।
সাংবাদিকদের সামাজিক ডাক্তার উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, শরীরে রোগ আছে কিনা জানতে যেমন মানুষ চিকিৎসকের কাছে যায়; তেমনি সাংবাদিকরাও সোশ্যাল ডক্টর (সামাজিক ডাক্তার)। সবসময় তাদের কাজই হল সমাজ পরিচালনার সীমাবদ্ধ ও ব্যর্থতাগুলোকে তুলে ধরা।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতা শুধু একটি চাকরি নয়; এটি মূলত একটি সমাজসেবামূলক পেশা। গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, বৈষম্য দূরীকরণ এবং সব ধর্ম ও গোষ্ঠীর মানুষের সমান অধিকারের পক্ষে কাজ করাই সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র।
ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, সংবিধানে মাত্র দুটি পেশাকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও স্বাধীন গণমাধ্যম। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, যেসব সমাজে সাংবাদিকতা শক্তিশালী ও স্বাধীন, সেসব সমাজে গণতন্ত্র সুদৃঢ় হয় এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
মাহফুজ আনাম বলেন, একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতাই সরকারকে সত্য কথা বলে। সরকার আপনি মনে রাখবেন, আপনাকে কেউ সত্য কথা বলবে না। আপনার দলীয় লোকেরা বলবে না ভয়ে এবং আপনার সরকারের ব্যুরোক্রেসি বলবে না। আপনার সরকারের ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি বলবে না। তারা সব সময় আপনাকে প্রশংসার মধ্যে প্রশংসার জগতে আবদ্ধ রাখবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান, আপনাকে সত্য কথা বলে।
বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাহফুজ আনাম বলেন, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও স্বাধীন সাংবাদিকতা একে অপরের পরিপূরক। ‘কনটেম্পট অব কোর্ট’ যেন স্বাধীন সাংবাদিকতা দমনের হাতিয়ার না হয়, সেই অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের কর্মকা- সম্পর্কেও জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
পেশাগত নৈতিকতা সম্পর্কে সাংবাদিকদের উদ্দেশে মাহফুজ আনাম বলেন, আমরা যারা সাংবাদিকতায় এসেছি, এই উপলব্ধিতা আমাদের থাকতে হবে। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে, সামাজিক জীবনে সততা, নিষ্ঠা এবং সঠিক, স্বাধীন সাংবাদিকতা করার যে মৌলিক, যে এথিক্যাল ভ্যালু, আমি অনুরোধ করব, আপনারা সেটাকে নিজের জীবনে, নিজের চেতনায় সব সময় ধরে রাখবেন। কেননা আমরা সাংবাদিক হয়ে যদি এই মূল্যবোধের পেছনে না থাকি; তাহলে সমাজ তা সমাধান করবে না।
সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য থাকাটা জরুরি এমন মন্তব্য করে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, যেকোনো বিষয়ে, যেকোনো সময়, যেকোনো বিরোধই ক্ষতিকারক। তিনি বলেন, যে মতের, যে চিন্তার, যে ভাবনার, যে আদর্শের হোক না কেন, সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ইত্যাদিসহ সব বিষয়ে আমাদের ঐক্য থাকতে হবে, সমঝোতা থাকতে হবে এবং আমাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
মতিউর রহমান বলেন, এই যে সমবেত হওয়া, ঐক্য থাকা, ঐক্যবদ্ধ থাকা, একত্র হওয়া, একে অপরের পাশে থাকা, একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের প্রতি সংহতি-সহানুভূতি জানানো খুবই জরুরি। তিনি বলেন, এটা ভাবার কোনো কারণ নাই যে, আগামী নির্বাচিত সরকার আসলেই আমাদের সবকিছু আমরা পেয়ে যাব। তা অতীতেও হয়নি, এখনো হবে না।
প্রথম আলো, ডেইলি স্টারে হামলা ও আগুন দেওয়া কারও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়। শুধু একটি ভবনের ওপর আক্রমণ নয়; বরং মধ্যযুগীয় বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ এমন মন্তব্য করে নূরুল কবীর বলেন, পৃথিবীর সভ্যতা বিকাশের এই পর্যায়ে, মধ্যযুগীয় কায়দায় কতগুলো সাংবাদিককে উপরে রেখে, চারদিকে আগুন দিয়ে, দমকল বাহিনী আসলে বাধা দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার মধ্যযুগীয় একটা বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ।
গণমাধ্যমের ব্যক্তিদের এই হামলার ঘটনাকে সমর্থনের সুযোগ নেই। কারও সমর্থন আছে কি নেই, সেটার সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক নেই; বরং এমন পরিস্থিতিতে সব গণমাধ্যম সমানভাবে হুমকির মুখে আছে। তিনি আরও বলেন, আজকে এটার মধ্যে হয়েছে কালকে আপনারটার মধ্যে হবে। পরশু দিন আরেকটার মধ্যে হবে।
তিনি বলেন, সমাজে ভিন্ন মত থাকবে, ভিন্ন কণ্ঠ থাকবে, ভিন্ন ভিন্নভাবে মানুষ কথা বলবে। এই বৈচিত্র্য জারি রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
সাংবাদিকতার মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা কোনো অপরাধের আকাক্সক্ষা হতে পারে না বলে উল্লেখ করে নূরুল কবীর আরো বলেন, গণমাধ্যম যদি উচ্চকণ্ঠ না থাকে, তাহলে সমাজে অনেক ধরনের অপরাধ ছড়িয়ে পড়ে।
সাংবাদিকতায় পেশাগত স্বাধীনতা, ব্যক্তিপূজা পরিহার ও সাংবাদিকদের বিকল্প দক্ষতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে শফিক রেহমান বলেন, সাংবাদিকতা করতে হলে স্বাধীনতাটুকু আপনাকে অর্জন করতে হবে, শুধু সাংবাদিকতার ওপর নির্ভর করলে একদিন না একদিন আপসের ফাঁদে পড়তে হবে। সে জন্য শিক্ষকতা, গবেষণা, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
শফিক রেহমান বলেন, সাংবাদিকতা শুধু চাকরি নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব, যেখানে স্বাধীনতা বজায় রাখতে হলে আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতা এখনো বাংলাদেশে পূর্ণ মর্যাদার পেশা হয়ে ওঠেনি। তবে এই মর্যাদা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সাংবাদিকদেরই। তাঁর প্রস্তাব, পত্রিকার জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড কমিটি গঠনের, যা সম্পাদনা ও পেশাগত নীতিমালার মান নির্ধারণ করবে।
সাংবাদিকদের ‘দালাল বলা’ হলে তাঁর দুঃখবোধ হয় এমন আক্ষেপ করে শফিক রেহমান বলেন, বলবে না কেন? যারা ছিল কয়দিন আগে আওয়ামী লীগের পক্ষে, তারা হয়ে গেল সব এখন বিএনপির পক্ষে। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার নাকি? এটা ম্যাজিক। এই ম্যাজিক কেন? আপনারা পাল্লায় পড়েছেন? এই ম্যাজিকে আপনি পড়বেন না। সুতরাং এতে আপনার সম্মান বাড়ছে না।’
সাংবাদিকতার ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রকাশক, সম্পাদক ও লেখকের দায়িত্ব আলাদা করে তুলে ধরেন শফিক রেহমান। তাঁর মতে, লেখকের প্রধান কাজ চিন্তা করে লেখা, ক্ষমতার সঙ্গে আপস নয়। তিনি বক্তা নন, লেখক হতে চেয়েছিলেন এবং আজও তা-ইই হতে চান।
শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে শফিক রেহমান বলেন, জেলখানায় যাওয়ার পরে আমি আমার বাম চোখ হারিয়েছি, বাম কান হারিয়েছি। ডান কানে খুব কম শুনি এবং ডান চোখে এখন আমি বলে ৫০ শতাংশ দেখছি। আমি কিন্তু কানের মধ্যে মেশিন লাগিয়েই আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি।’ তবু এসব প্রতিবন্ধকতা আমাকে মতপ্রকাশ থেকে বিরত রাখতে পারেনি।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শফিক রেহমান বলেন, ১৯৭৪ সালে তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁকে দেশ ছাড়তে হয় এবং দীর্ঘ সময় নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। লন্ডনে প্রায় ২৯ বছর অবস্থানকালে তিনি ব্রিটিশ গণমাধ্যম ও সম্প্রচারজগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তবে তিনি সচেতনভাবে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ছবি বা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলেছেন বলে জানান।



