শেষ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবেই ভেঙে গেল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নির্বাচনি সমঝোতা। রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে জামায়াত শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে না- ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ থেকে সরে যাওয়ার যুক্তি হিসেবে এটিকেই মূল কারণ হিসেবে বলছে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন। পাশাপাশি আসন বণ্টন, নীতি ও ইনসাফের প্রশ্নেও বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছে দলটি।
কেন ইসলামী আন্দোলন ১১ দলের আসন সমঝোতা থেকে সরে গেল, সেই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শুক্রবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর শক্তি-সামর্থ্য বেশি থাকলে নৈতিক ও আদর্শিকভাবে ইসলামী আন্দোলনও কারো চেয়ে দুর্বল নয়। জামায়াতের আমির (ডা. শফিকুর রহমান) ক্ষমতায় গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন বলে জানিয়েছেন।
জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকের পর একজন খ্রিষ্টান নারী স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা আশ্বস্ত হয়েছেন, জামায়াত রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করবে না। বিষয়টি জানার পর ইসলামী আন্দোলন বুঝতে পেরেছে, যে লক্ষ্য নিয়ে তাদের দল এগিয়ে যাচ্ছে, সে লক্ষ্য অর্জিত হবে না।’
ইসলামী আন্দোলনের সংবাদ সম্মেলনের পর তাদের বিরুদ্ধে ওঠা কিছু বিষয়ে শুক্রবারই বক্তব্য দিয়েছে জামায়াত। দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান সম্প্রতি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের একটি সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতার বরাত দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। এব্যাপারে জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিং চলাকালেই তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গাজী আতাউর রহমান এমন মন্তব্য করেছেন।’
এদিকে, গতকাল শনিবার বিকালে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে দেখা করেছেন বর্তমানে ১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
পরে সেখানে সাংবাদিকরা তার কাছে প্রশ্ন রাখেন- জামায়াত ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে না, ইসলামী আন্দোলনের এমন অভিযোগের বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি? জবাবে মামুনুল হক বলেন, ‘জামায়াতের আমিরের কথার মূল অর্থ হলো, যে প্রক্রিয়ায় বর্তমানে দেশ চলছে, নির্বাচন হচ্ছে, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে রাজনীতির ধাপে-ধাপে অগ্রসর হতে হচ্ছে, এই প্রক্রিয়ায় এক দফার মধ্য দিয়ে হঠাৎ করে একদিনেই শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সেটিই জামায়াতের আমির বলেছেন। এই কথার মধ্যে কোনো অসংগতি নেই।’
ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আসন সমঝোতার আর সুযোগ নেই,
৪৭ আসন এখন জোটের দলগুলোর মধ্যে বণ্টন হবে: মামুনুল হক
জামায়াত নেতা আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে দেখা করার পর মামুনুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এই মুহূর্তে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আসন সমঝোতার আর কোনো সুযোগ নেই। তবে রাজনৈতিক সমঝোতা হতে পারে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য ৪৭টি আসন রাখা হয়েছিল। কিন্তু দলটি জোটে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই আসনগুলো এখন জোটের অন্য দলগুলোর মধ্যে ভাগাভাগি হবে।
তিনি বলেন, শুরু থেকে যে প্রক্রিয়ায় আসন বণ্টন হয়েছে, ইসলামী আন্দোলন না আসায় সমঝোতার ভিত্তিতে একই প্রক্রিয়ায় আসন বণ্টন হবে। যে আসনে যে দলের প্রার্থীকে সবচেয়ে শক্তিশালী মনে করা হবে, তাকেই একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হবে।
১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন ঠিক রেখে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগেই আটটি ইসলামি দল সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদ নির্বাচন এবং এর আগেই আলাদভাবে গণভোট করার দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে নেমেছিল। পরে তারা একসঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একপর্যায়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও অলি আহমদের এলডিপিসহ আরো তিনটি দল এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়।
তবে, আসন ভাগাভাগি নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে টানাপোড়েন দেখা দেয় ইসলামী আন্দোলনের। সমঝোতা না হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার জামায়াতের নেতৃত্বাধীন এই জোট ২৫৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে। যেখানে জামায়াতের আসন থাকে ১৭৯টি। বাকি দলগুলোর মধ্যে এনসিপিকে ৩০টি, এলডিপিকে ৭টি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ২০টি আসন দেওয়া হয়। ৪৭টি আসন রেখে ইসলামী আন্দোলনকে জোটে ফেরানোর আশা করা হলেও দলটি শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে জোট ছেড়ে এককভাবে ২৬৮টি আসনে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত জানায়। ফলে ওই ৪৭টি আসন নিয়ে এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে জোট নেতাদের।
আগামী মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিন। এর আগেই আসনগুলো বণ্টন হয়ে যাওয়ার আশা প্রকাশ করে মামুনুল হক বলেন, এরপর আসনগুলোতে যে দলের প্রার্থী থাকবেন, তিনি ছাড়া বাকিরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন।
জোট থেকে ইসলামী আন্দোলনের বেরিয়ে যাওয়া নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক বলেন, সম্মিলিতভাবে ঐক্যের প্রতি মানুষকে আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই অঙ্গীকার থেকে সরে যায়নি দলগুলো। তাই খুব বেশি প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।
ইসলামী আন্দোলনের সংবাদ সম্মেলনে জোটের ইসলামপন্থী দলগুলো ঠিক পথে আছে কি-না, সেই প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। এবিষয়ে মামুনুল হক বলেন, তাদের দল ঠিক পথেই আছে। তবে অন্যের অনুভূতিকে শ্রদ্ধা জানায় তার দল। চরমোনাই পীরের দলের জোটে না থাকার নেপথ্যে অন্য কিছু রয়েছে কি-না, সেই প্রশ্ন করা হলে মামুনুল হক বলেন, ‘ষড়যন্ত্র আছে বলে মনে হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে একসঙ্গে নির্বাচন করতে না পারাকে নিজেদের ব্যর্থতা বলেই ধরে নেওয়া যায়।’
ইসলামী আন্দোলনের জন্য জামায়াতের দরজা খোলা, ৪৭টি
আসনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে লিয়াজোঁ কমিটি: এহসানুল মাহবুব
জোট নিয়ে উদ্ভুত পরিস্থিতি ও দলের নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়ন নিয়ে গতকাল জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠক হয়েছে। রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক শেষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সাংবাদিকদের জানান, ইসলামী আন্দোলনের জন্য জামায়াতের দরজা এখনো খোলা রয়েছে। সবার জন্য জামায়াতের দরজা খোলা আছে।
ইসলামী আন্দোলনের জন্য রাখা ৪৭টি আসনের বিষয়ে এখন কী সিদ্ধান্ত হবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসনগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে লিয়াজোঁ কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে জানালে শীর্ষ নেতৃত্ব বসে সিদ্ধান্ত নেবেন।
মাহবুব জুবায়ের জানান, নির্বাচনের জন্য দলীয় ইশতেহার চূড়ান্ত করাসহ বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে নির্বাহী পরিষদের বৈঠক হয়েছে। দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে এই বৈঠকে দলের নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, নির্বাহী পরিষদ সদস্যসহ মহিলা বিভাগের দায়িত্বশীল ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কিছু ‘পলিসি পেপার’ বৈঠকে প্রস্তাব আকারে এসেছে। বিশেষজ্ঞ দল তা বৈঠকে পেশ করেছে। ‘পলিসি পেপার’-এর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে গেলে পলিসি পেপার প্রয়োজন হয়। এসব বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত হলে জাতিকে জানানো হবে এবং দলের ওয়েবসাইটেও দেওয়া হবে।
ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়ায় আসন বাড়ানোর চেষ্টা এনসিপির
নির্বাচনি ঐক্য থেকে ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়ায় ভাগে নিজেদের আসন বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সেজন্য চেষ্টাও শুরু করেছে দলটি।
এনসিপি সমঝোতায় ৩০টি আসনে ছাড় পেয়েছে। কিন্তু শুরু থেকেই জামায়াতের কাছ থেকে ৩৫ থেকে ৪০টি আসন চাইছিল দলটি। সেই লক্ষ্যে ৪৭টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৫০টির মতো আসন ফাঁকা রাখার কথা ছিল। এখন যেহেতু তারা বেরিয়ে গেছে, ফলে এনসিপির আসন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনাও শুরু করেছে দলটি। এনসিপির আশা, তাদের আরো ১০ থেকে ১৫টি আসন বাড়তে পারে।



