তিনজনে দুই জনই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা !

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার নির্ভুল ও সঠিক তথ্যভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে পারেনি কোনো সরকার। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম সংখ্যা দেওয়া হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। এ পর্যন্ত মোট আটবার মুক্তিযোদ্ধা তালিকা সংশোধন হয়েছে। অতীতে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার জন্য তদ্বির ও দৌড়ঝাঁপ করেন, দেওয়াও হয়। এসব সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে মানা হয়নি কোনোরকম নিয়মকানুন।

সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে যে-যার প্রয়োজনে ও সুবিধা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধার গেজেট করান। মন্ত্রণালয়ও একেক সময় একেক পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ফলে তালিকায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে অনেকে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি তিনজনের মধ্যে দুই জনই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা! স্বাধীনতার ৫৫ বছরে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা কমে আসার কথা ছিল। সেখানে কমার পরিবর্তে দিন দিন বেড়েছে।

এমন অবস্থায় বিএনপি সরকার মুক্তিযোদ্ধার তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। গত রবিবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাই ও সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি গতকাল মঙ্গলবারও মন্ত্রণালয়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সাথে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাই করা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্র্বতী সরকার গঠিত হলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান ফারুক-ই-আজম বীরপ্রতীক। দায়িত্ব নেওয়ার পর এক সপ্তাহের মাথায় মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও তালিকা যাচাই-বাছাইয়ে নির্দেশ দেন তিনি। সব জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের (ওই জেলা-উপজেলার) তালিকা টাঙানো হয়।

এ তালিকা দেখে স্থানীয়রা নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে অমুক্তিযোদ্ধাদের শনাক্ত করে সরকারকে তথ্য পাঠানো শুরু করে। দেশের জেলা, উপজেলা থেকে মন্ত্রণালয়ে এবং জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) ৯০ হাজারের বেশি মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে ভুয়া হিসেবে অভিযোগ জমা পড়ে। জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ে নির্দেশনা দেয় মন্ত্রণালয়। গত বছরের জুনে শুরু হয় শুনানি।

শুনানিতে মাঠ প্রশাসন, অভিযোগকারী মুক্তিযোদ্ধা, স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি ও অভিযোগ ওঠা ব্যক্তি/স্ত্রী-সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনাপ্রবাহ ও তথ্যপ্রমাণসহ অংশগ্রহণ করতে বলা হয়। তবে সময় স্বল্পতার কারণে এই কাজ শেষ করতে পারেনি অন্তবর্তী সরকার। গত ২৪ ডিসেম্বর জালিয়াতি ও ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণ করায় ৭১ জন ব্যক্তির গেজেট বাতিল করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইনের ধারা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই শেষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরমধ্যে অপরাধ স্বীকার করে স্বেচ্ছায় বাতিলের আবেদন করেন ১২ জন ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা। এর আগে নির্ধারিত বয়সের (১২ বছর ৬ মাস) কম হওয়ায় ২ হাজার ১১১ জন মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করা হয়েছে। এ নিয়ে বিগত ১৫ বছরে ৩ হাজার ৯৯৭ মুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল হলো।

জামুকা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তি যাচাই-বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জামুকা সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত দেশে ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৮ হাজার ৫০ জন। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তের সংখ্যা ৮৯ হাজার ২৩৫ জন। গেজেট বাতিল, মুক্তিযোদ্ধার বয়সসীমা নির্ধারণসহ প্রায় ১৪ ক্যাটাগরিতে মোট মামলার সংখ্যা ২ হাজার ৭১৯টি।

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) মহাপরিচালক শাহিনা খাতুন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা অনেক আছে। যাচাই করে বাদ দেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে অভিযোগ শুনানি অব্যাহত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, অনেকে জমি নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা হিংসার বশবর্তী হয়ে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছেন। আবার অনেকে অভিযোগ জমা দিলেও শুনানিতে হাজির হননি। এ কারণে অন্তবর্তী সরকারের সময় অভিযোগ শুনানিতে গতি আসেনি। তিনি নিজেই কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে অভিযোগ শুনানিতে যান।

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনের আওতায় ২০০২ সালে জামুকা চালু হয়। আইনটি প্রণীত হয় ওই বছরের ৩ জুন। বিগত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ২০ বছর পর ২০২২ সালে আইনটি ‘পরিমার্জনপূর্বক যুগোপযোগী’ করে নতুনভাবে প্রণয়ন করে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্র্বতী সরকার গত ৩ জুন মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধন করে। তাতে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ ও ‘মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী’ নামে দুটো আলাদা ভাগ করা হয়।

সম্প্রতি রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা নঈম জাহাঙ্গীর বলেন, মুক্তিযোদ্ধা বানানোর যাত্রাটা কবে শুরু হয়েছে? যেদিন জামুকার জন্ম হয়েছে। জামুকা হলো ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সরকারি বৈধতা দেওয়ার প্রধান কারিগর। তিনি বলেন, ‘অর্থের বিনিময়ে তারা মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের দালাল বানিয়ে তাদের মাধ্যমে অর্থ নেওয়া হয়েছে। জামুকা তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মনে এই ধরনের প্রশ্ন ছিল না।’

নঈম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘এটি কোনও কাল্পনিক কাহিনী নয়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তখনকার অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট অব বাংলাদেশ একটি চিঠি লিখেছিলেন ৮০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার ভরণ-পোষণ, যাতায়াত খরচ এবং অন্যান্য খরচ বহন করার মত টাকা এই মুহূর্তে আমাদের কাছে নাই। টাকা সংগ্রহ করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘৮০ হাজার, এখন মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় কতজন আছে? প্রায় আড়াই লাখ। তার মানে প্রতি তিনজনের মধ্যে দুই জনই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। আমরা এই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার রাজত্বে বসবাস করছি।’

সময়ে সময়ে তালিকা প্রকাশ: মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের আমলে এ পর্যন্ত আটবার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথম তালিকা করা হয় ১৯৮৬ সালে। তখন জাতীয় কমিটির তৈরি এক লাখ দুই হাজার ৪৫৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম পাঁচটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ করা হয়। তবে ওই তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়নি।

১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট্রের করা তালিকায় এ সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার ৮৯২। এর মধ্যে বেসামরিক বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৫১ হাজার ৫২৬ এবং বিশেষ তালিকায় ছিলেন ১৯ হাজার ৩৬৬ জন। পরে ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় ৮৬ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। এরপর ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এক লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করে; যা মুক্তিবার্তা (সবুজ) নামে পরিচিত।

তালিকা প্রকাশের ধারাবাহিকতায় ওই তালিকা যাচাই-বাছাই করে মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত মুক্তিবার্তায় এক লাখ ৫৮ হাজার ৪৫২ জনের আরেকটি তালিকা (লাল মুক্তি বার্তা নামে পরিচিত) প্রকাশ করা হয়। এরমধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪৭ হাজার সনদে সই করেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দুই লাখ ১০ হাজার ৫৮১ জনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এবং পরে এক লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জনের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করে।

২০১১ সালে ওই তালিকা সংশোধনসহ নতুন করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দিতে আবেদন গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। এর আলোকে ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে অনলাইন ও সরাসরি প্রায় এক লাখ ৩৯ হাজার আবেদন জমা নেওয়া হয়। অন্তবর্তী সরকারের সময় ২১৯২ জনের গেজেট বাতিল করে। এর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যার নতুন তালিকা তৈরি হয়। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও মানদন্ড এখন পর্যন্ত ১১ বার বদলানো হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার আবেদন পেয়ে হতাশ হয়েছি। গত প্রায় এক বছর ধরে যাচাই-বাছাই চলেছে। এখানেও রয়েছে আদালতে রুজু করা মামলা। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা কমে আসার পরিবর্তে দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়াকে অস্বাভাবিক আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। অভিযোগ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিভিন্ন সুবিধা, মাসিক ভাতাসহ এলাকায় প্রভাব খাটাতেই বিভিন্ন পন্থায় অনেকে বাগিয়ে নিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সনদ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে নতুন নতুন তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে।

১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে যারা শহীদ হয়েছেন এবং যারা জীবিত মুক্তিযোদ্ধা আছেন, ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তাদের সংখ্যা ছিল ৮৬ হাজার। তাদের কল্যাণ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা, নীতি ও কার্যক্রম প্রণয়ন ও দেখাশুনা করার জন্য স্বাধীনতা অর্জনের ৩০ বছর পর ২০০১ সালে ২৩ অক্টোবর আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে আলাদা মন্ত্রণালয় হিসেবে ‘মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়’ গঠন করা হয়। দেখা যাচ্ছে, গত ৩০ বছরে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার নতুন মুক্তিযোদ্ধা যুক্ত হয়ে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৫০ জনে। অথচ ৩০ বছর পর এসে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কমার কথা ছিল।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments