রাজধানীর রায়েরবাজারে বাসার সামনে স্কুলছাত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার আগে ফোন করে ডেকে নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।ঘটনার পর আশেপাশের সিসিটিভি ভিডিওতে অভিযুক্ত যুবকের সঙ্গে ওই কিশোরীকে একসঙ্গে হাঁটতে ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে দেখা গেছে।গ্রেপ্তারের পর অভিযুক্ত যুবক সিয়াম তাদের মধ্যে ‘প্রেমঘটিত বিরোধের’ কথা বলেছে।
তবে পারিপার্শ্বিক ঘটনা বিশ্লেষণে পুলিশ বলছে, তাদের মধ্যে ‘প্রেম না থাকলেও ভালো সম্পর্ক ছিল’।তাদের ফোন কলের রেকর্ডেও এই তথ্য মিলেছে।
এই স্কুলছাত্রীর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানাতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে সংবাদ সম্মেলনে এসে রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম বলেছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা ঘাতক সিয়ামকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করেছি।
বুধবার রাত ৯টার দিকে হাজারীবাগ থানার রায়েরবাজার এলাকায় বাসার সামনে শাহরিয়ার শারমিন বিন্তি (১৪) নামের নবম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থীকে এলোপাথাড়ি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।এই ঘটনায় করা মামলার একমাত্র আসামি সিয়ামকে বৃহস্পতিবার সকালে কলাবাগান এলাকার একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।এ সময় তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাকু, রক্ত মাখা গেঞ্জি ও প্যান্ট জব্দ করা হয়।
ডিসি মাসুদ আলম বলেন, আমরা হত্যকাণ্ডের পর পরই আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করি। ভিডিওতে ভিকটিম বিন্তির সঙ্গে সিয়ামকে একসঙ্গে হাঁটতে ও কথা বলতে দেখা গেছে। কথাবার্তার একপর্যায়ে সিয়াম ছুরি দিয়ে বিন্তিকে পেছন থেকে এলোপাথাড়ি ছুরিকাঘাত করে।ছুরিকাঘাতের পর সিয়াম সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। সেখানে অনেক মানুষজন ছিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে নির্বিঘ্নে বাইকে করে চলে যায়।
সিয়ামকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে তিনি বলেন, ওই মেয়েটার সঙ্গে সিয়াম একই স্কুলে পড়াশোনা করতো। সিয়াম দাবি করেছে, তাদের মধ্যে চার বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মাঝখানে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। সে ধারণা করে, মেয়েটা অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে।এ কারণে মেয়েটাকে খুন করার জন্যই সে সাথে ছুরি নিয়ে এসেছে। সে ওই এলাকায় গিয়ে মেয়েটাকে ফোন করে ডেকে নিয়ে কথা বলে। কথা বলার একপর্যায়ে সম্পর্ক রাখা না রাখা নিয়ে ঝগড়া চরম পর্যায়ে পৌঁছলে সে ছুরিকাঘাত করে।
এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সিয়াম ভেবেছে, তাকে আর পাত্তা দিচ্ছে না বা তার সঙ্গে আর থাকবে না। সেজন্য মেয়েটাকে সে ‘রাখবে না’ ভেবেই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।বিন্তির মা নাদিয়া ঘটনার পরপরই অভিযোগ করেছিলেন, সিয়াম নামে এক তরুণ বিন্তিকে কুপিয়ে পালিয়ে গেছে। সিয়াম তার মেয়েকে প্রায়ই উত্যক্ত করতো।এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডিসি বলেন, সিয়াম যদি মেয়েটাকে উত্যক্ত করতো তাহলে ডাকলেতো মেয়েটার আসার কথা না। তারা একসঙ্গে হাঁটছিল, কথা বলছিল।
তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল কি না, মেয়েটা যেহেতু বেঁচে নেই তাই ক্রসচেক করতে পারছি না। তবে প্রেমের সম্পর্ক না থাকলেও তর্কের খাতিরে আমরা ধরে নিচ্ছি ভালো সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে আগে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, এখন অনিয়মিত যোগাযোগ ছিল।সিয়ামের মাদক সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে, তবে সে স্বীকার করেনি বলেও জানান তিনি।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাত ৮টার দিকে ছোট ভাই নাবিলকে নিয়ে বাসার নিচে নামে বিন্তি। এর কিছুক্ষণ পরই চিৎকার ও হট্টগোল শুনে স্বজনরা নিচে গিয়ে বিন্তিকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় শিকদার মেডিকেল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে রাত সোয়া ১০টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর আগে বিন্তি তার ওপর হামলাকারী হিসেবে সিয়ামের নাম বলে গেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
নিহতের মা নাদিয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সিয়াম দীর্ঘদিন ধরে বিন্তিে ফোনে এবং সরাসরি বিরক্ত করে আসছিল। এ নিয়ে তাকে সতর্কও করা হয়েছিল। তিনি বলেন, আমার নিস্পাপ মেয়েটাকে ওরা বাঁচতে দিল না। আমি সিয়ামের ফাঁসি চাই।ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুক জানান, নিহতের কাঁধ ও পিঠে ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।



