সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, তিন কারণে বর্তমান রাষ্ট্রপতি (মো. সাহাবুদ্দিন) অপরাধী। এই সংসদ জুলাই শহিদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে এই রাষ্ট্রপতি সেই সময়ের কোনো খুনের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করেননি এবং কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। কাজেই ফ্যাসিস্ট সরকারের এই দোসরের বক্তব্য আমরা সংসদে শুনতে পারি না। এই কারণেই আমরা ওয়াকআউট করেছি।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে বেরিয়ে সংসদ ভবনে প্রবেশের মূল গেইটে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াতের আমির বলেন, সরকারকে আমরা অনুরোধ করেছিলাম, যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর ছিল তারা যেন এখানে কোনো বক্তব্য রাখতে না পারে। প্রথমত, এই রাষ্ট্রপতি অতীতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেননি। দ্বিতীয় অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সেই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন। এতে তিনি জাতির সামনে ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন।
তৃতীয় অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংস্কার পরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্য এই দুই ভূমিকায় দায়িত্ব পালনের বিষয়টি একটি অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার কথা থাকলেও রাষ্ট্রপতি তা করেননি।
তিনি বলেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁর পক্ষে ভোট দিলেও সেই অনুযায়ী উদ্যোগ না নেওয়ায় রাষ্ট্রপতি জনগণকে অসম্মান করেছেন।
এসব কারণেই তারা রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুনতে রাজি নন বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে সরকারি দলকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ বন্ধ করার আহ্বান জানানো হলেও সেটি গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সংক্ষুব্ধ হয়ে সংসদ থেকে বের হয়ে এসেছি। ভবিষ্যতেও সংসদে কোনো অন্যায় হলে আমরা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবো এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাবো।
সংসদ যেন কারো চরিত্র হননের কেন্দ্রে পরিণত না হয়: শফিকুর রহমান
এর আগে সংসদে নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে দেওয়া বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জাতীয় সংসদ যেন কোনো ব্যক্তির চরিত্র হননের কেন্দ্রে পরিণত না হয়। অতীতে সংসদে জনস্বার্থের আলোচনা অপেক্ষা ব্যক্তিগত আক্রমণ ও চরিত্র হননের ঘটনাই বেশি ঘটেছে। আশা করবো- নতুন এই সংসদ হবে জনগণের কল্যাণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর মঞ্চ।
তিনি বলেন, বর্তমান সংসদ কোনো গতানুগতিক সংসদ নয়। এটি দাঁড়িয়ে আছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন ও বিপ্লবের রক্তের ওপর। গত সাড়ে ১৫ বছরে যারা নির্যাতিত হয়েছেন এবং জুলাইয়ের আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের ত্যাগের বিনিময়েই আজ এই সংসদে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্পিকারের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছরে খুব অল্প সময়ের জন্য সংসদীয় গণতন্ত্র কার্যকর ছিল। অধিকাংশ সময়ই দেশ ফ্যাসিবাদী শাসনের অধীনে ছিল এবং সংসদ ছিল কার্যত একটি ‘ডামি’ বা অকার্যকর প্রতিষ্ঠান। অতীতে যারা স্পিকারের দায়িত্বে ছিলেন, তারা অনেক ক্ষেত্রেই গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের প্রশ্নে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেননি।
বর্তমান স্পিকার দলীয় পদ ত্যাগ করে দায়িত্ব গ্রহণ করায় তার কাছ থেকে নিরপেক্ষ আচরণ প্রত্যাশা করছেন বলে জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, স্পিকারের কাছে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, এটাই জনগণের প্রত্যাশা। সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় ন্যায়বিচার ও ইনসাফ নিশ্চিত হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংসদের পরিবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণের কল্যাণ, রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণমূলক আলোচনাই হওয়া উচিত সংসদের প্রধান কাজ। কিন্তু অতীতে বহু সময় দেখা গেছে, সংসদে নীতিগত আলোচনার চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপমানের ঘটনাই বেশি ঘটেছে। তাই তিনি স্পিকারের প্রতি অনুরোধ জানান, সংসদ যেন কখনও ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্র হননের মঞ্চে পরিণত না হয়।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের স্লোগান ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’-এর কথা উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে সংসদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ সঠিকভাবে চললে নির্বাহী ও বিচার বিভাগও সঠিকভাবে কাজ করবে। সংসদের মাধ্যমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের নানা অসংগতি ও দুর্নীতি দূর হবে- এটাই দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা। তিনি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানান এবং সংসদের সকল গঠনমূলক কার্যক্রমে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সহযোগিতা ও সমর্থনের আশ্বাস দেন।
ফ্যাসিস্টের দোসরের বক্তব্যের প্রতিবাদে এই ওয়াকআউট: নাহিদ
রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে বেরিয়ে সংসদ ভবনে প্রবেশের মূল গেইটে সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ফ্যাসিস্টের দোসর রাষ্ট্রপতি বক্তব্য দেওয়ার প্রতিবাদ স্বরূপ আমরা সেখান (সংসদ) থেকে ওয়াকআউট করেছি।
তিনি বলেন, আজকে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ছিল। সেই অধিবেশন উপলক্ষেই আমরা সরকারি দল-বিরোধী দল অংশগ্রহণ করেছিলাম সংসদের কার্যক্রমে। আমরা কার্যক্রমের শুরু থেকেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে সবগুলো অংশে অংশগ্রহণ করেছি, আমাদের বক্তব্য রেখেছি।
নাহিদ বলেন, আমরা স্পিকারের কাছে বলেছিলাম, ফ্যাসিবাদের দোসর, এমন কেউ এই সংসদে বক্তব্য দিতে পারবে না। কারণ এই সংসদ হচ্ছে ফ্যাসিবাদমুক্ত সংসদ। হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা এই সংসদ পেয়েছি। সরকারি দল বা বিরোধী দল, যারাই এখানে নির্বাচিত হয়েছেন; তারা নির্বাচিত হতে পেরেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের শহিদদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে, ফ্যাসিবাদকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে। ফলে ফ্যাসিস্টের সঙ্গে জড়িত কেউ এই পার্লামেন্টে বক্তব্য দিতে পারবেন না।
সংসদ থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণ জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, যখন ফ্যাসিস্টের দোসর রাষ্ট্রপতি বক্তব্য দিতে এসেছেন, আমরা স্পিকারের কাছে বারবার আহ্বান করেছিলাম আমাদের এই বিষয়ে বক্তব্য রয়েছে, বিরোধীদলীয় নেতা সেটা উপস্থাপন করবেন। কিন্তু সেই সময়টা আমাদের দেওয়া হয়নি, আমাদের ফ্লোর দেওয়া হয়নি। এর প্রতিবাদস্বরূপ আমরা সেখান থেকে ওয়াকআউট করেছি।



