আজ ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লড়াইটা শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। জাতি বীর শহীদদের আত্মদানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে আজ।
একাত্তরের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাঙালি জাতির ওপর হামলে পড়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। কিন্তু বাঙালি জাতি সর্বশক্তি দিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াইয়ের সূচনা করে। ৯ মাসের ধারাবাহিক রক্তক্ষয়ী লড়াই, অকাতরে আত্মদান এবং বীরত্বের স্বাক্ষর রেখে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।
জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। দিবসটি উপলক্ষে আজ ভোরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে তারেক রহমান প্রথমবার স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবার প্রথমবারের মতো জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় আচারের অংশ হিসেবে তিনি স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদ্যাপনের জন্য সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এ উপলক্ষে তিন স্তরের নিরাপত্তা জোরদার করেছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ঢাকাসহ দেশের সকল জেলা ও উপজেলায় একত্রিশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের সূচনা হবে।
সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনসমূহ, সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকার দৃশ্যমান উঁচু ভবনসমূহে বৃহদাকার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের পরে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যবৃন্দ, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এছাড়া বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিকগণও জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনে গৌরবের দিনটি পালন করবে।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।
ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে দেশবাসীকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ইনসাফভিত্তিক, স্বনির্ভর, নিরাপদ ও কর্মমুখর বাংলাদেশ বিনির্মাণে দল-মত-পথ নির্বিশেষে দেশবাসীকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ‘মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস’ উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে তিনি দেশে ও প্রবাসে বসবাসরত সকল বাংলাদেশিকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভিনন্দন জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দীর্ঘদিনের অপশাসন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও অনাকাক্সিক্ষত জ্বালানি পরিস্থিতির বিরূপ প্রভাব দেশ ও দশের ওপর পড়ছে। সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে একটি স্বনির্ভর, গতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলেছে। এসময় দৃঢ় জাতীয় ঐক্য, সহমর্মিতা ও দেশপ্রেম খুব জরুরি।
মহান স্বাধীনতা দিবস আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের চেতনাকে নতুন করে উজ্জীবিত করে: প্রধানমন্ত্রী: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের জীবনে সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের চেতনাকে নতুন করে উজ্জীবিত করে। ‘মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস’ উপলক্ষে এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণসহ প্রবাসে বসবাসরত সকল বাংলাদেশিকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে এবং দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির অগ্রগতি ও উন্নয়নের ধারাকে আরও বেগবান করতে জাতীয় ঐক্য, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং দেশপ্রেমের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আসুন, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করি। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করি।’
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি ১০ টাকা মূল্যমানের একটি উদ্বোধনী খাম, ৫ টাকা মূল্যমানের একটি ডাটাকার্ড এবং একটি বিশেষ সিলমোহর উদ্বোধন করেন।
বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নিজ দপ্তরে তিনি এসবের উদ্বোধন করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাতীয় স্মৃতিসৌধে নেওয়া হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
এছাড়া এবার সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ঢাকার গাবতলী থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত সড়কে তোরণ, পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন লাগানো হয়নি। জ্বালানি সংকট মাথায় রেখে কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্দেশ্যে এবার ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে দেশব্যাপী কোনো আলোকসজ্জা করা হবে না।
আজ বিকালে বঙ্গভবনের সবুজ লনে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবার ও জীবিত খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
২৬ মার্চ সকাল আটটায় দেশের সকল বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশ ও ডিসপ্লে অনুষ্ঠিত হবে। আজ সকাল ৯টায় জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজ ও ফ্লাই পাস্ট অনুষ্ঠিত হবে।
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে সশস্ত্র বাহিনীর অর্কেস্ট্রা দল ও ওয়ারফেজের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে রাষ্ট্রের পদ্ধতিগত সংস্কার জরুরি: স্বাধীনতাকে অর্থবহ ও কার্যকর করতে রাষ্ট্রের নীতিগত ও পদ্ধতিগত সংস্কার জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর)।
৫৬তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বুধবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও দেশে সংবিধান মেনে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা দুঃখজনক। চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই স্বৈরাচার উৎখাত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও জনগণ বঞ্চিত: স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের সাধারণ মানুষ এখনও স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে আকাক্সক্ষা নিয়ে দেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।
মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ মন্তব্য করেন তিনি।



