এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। গ্রাহক পর্যায়ে ডিজেল অকটেন, পেট্রোল এবং কেরোসিনের দাম মার্চের সমপরিমাণ রেখেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনকে (বিপিসি) নির্দেশনা দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এর মাধ্যমে তেলে ভর্তুকি দিয়ে হলেও অবৈধ মজুতদারি বন্ধ বা কমানো যাবে বলে আশা করছে সরকার।
এদিকে দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির মধ্যে রাতে অকটেন ও পেট্রোল বিক্রি বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন পেট্রোল পাম্প মালিকরা। মোটরবাইসহ ছোট যানবাহনের এই জ্বালানি বিক্রির জন্য সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের জন্য তারা দাবি জানিয়েছেন। তবে বাস-ট্রাকসহ পরিবহনে এবং সেচে ডিজেল সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ফিলিং স্টেশনগুলো সবসময় চালু রাখা হবে।
অপরিবর্তিত তেলের দাম
জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা (সংশোধিত) অনুযায়ী ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা নির্ধারণ করে তা বহাল রাখা হয়েছে। গতকাল বিকালে জ্বালানি বিভাগের জারি করা নতুন এই মূল্যহার আজ ১ এপ্রিল থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
এর আগে গতকাল দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছিলেন, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রতিমাসের মতো জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা করা হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশে বর্তমানে (৩০ মার্চ পর্যন্ত) মোট ১ লাখ ৯২ হাজার ৯১৯ টন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ডিজেল রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ টন, অকটেন ৭ হাজার ৯৪০ টন, পেট্রোল ১১ হাজার ৪৩১ টন এবং জেট ফুয়েল রয়েছে ৪৪ হাজার ৬০৯ টন। বর্তমানে মজুদ থাকা এই জ্বালানি তেল দিয়ে আগামী ১৫ থেকে ১৬ দিন পর্যন্ত দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
মনির হোসেন আরও জানান, এপ্রিল মাসে আরও প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল দেশে আসবে। ফলে এ মাসেও জ্বালানি সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। অকটেন ও পেট্রোলের ব্যবহার তুলনামূলক কম। মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল, যা মূলত কৃষি সেচ ও গণপরিবহনে ব্যবহৃত হয়।
রাতে অকটেন-পেট্রোল বিক্রি বন্ধের প্রস্তাব
রাতে পাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। দুষ্কৃতকারীদের তৎপরতা, হামলা ও ভাঙচুরের আশঙ্কায় কর্মীরা আতঙ্কে থাকছেন। এমনকি অতীতে পাম্পের ব্যবস্থাপক বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হয়েছেন। এ অবস্থায় রাতে পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি চালু রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে দাবি করে রাত ৮টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত অকটেন-পেট্রোল বিক্রি বন্ধ রাখতে সরকারের কাছে দাবি জানান তারা। রাজধানীর মগবাজারে সংগঠনের কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এ দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরে।
সংগঠনের সভাপতি নাজমুল হকের বক্তব্যে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্বাভাবিকভাবে তেল বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই পাম্পে নিরাপত্তা জোরদার করা, পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। একইসঙ্গে পাম্পে অযথা হামলা ও মালিকদের একতরফাভাবে দোষারোপ না করার আহŸান জানান তিনি।
একটি ট্যাংক লরির ধারণক্ষমতা সাড়ে চার হাজার লিটার হলেও অনেক ক্ষেত্রে কম তেল দেওয়া হচ্ছে। যেমন যদি একটি লরিতে ৪৫০০ লিটারের পরিবর্তে মাত্র ২০০০ লিটার তেল দেওয়া হয়, তাহলে একই পরিবহন খরচ বহন করতে হয়, ফলে খরচ কার্যত দ্বিগুণ হয়ে যায়। এছাড়া লরির চেম্বার খালি থাকলে সেখানে চুরি বা অপচয়ের ঝুঁকি বাড়ে। তাই ট্যাংক লরিতে পূর্ণ ধারণক্ষমতা অনুযায়ী তেল সরবরাহের সুযোগ দেওয়া উচিত।
পাম্পে তেল থাকা সত্তে¡ও বিক্রি বন্ধের ব্যাখ্যা দিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়, কোনো পাম্পের ট্যাংক পুরোপুরি খালি হয়ে গেলে পরবর্তীতে সেখানে তেল ঢালার সময় এয়ার লক তৈরি হয়। এতে পাইপলাইন পরীক্ষা করে পুনরায় সরবরাহ চালু করতে ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়। অনেক সময় ট্যাংকে ২০০-৪০০ লিটার তেল রেখে সরবরাহ বন্ধ করা হয় যাতে পুরো সিস্টেম অচল হয়ে না যায়।
৬৪ জেলায় এক দিনে ৮৭,৭০০ লিটার তেল উদ্ধার
গত সোমবার ৮৭,৭০০ লিটার অবৈধভাবে মজুতকৃত জ্বালানি উদ্ধার করেছে বিভিন্ন জেলা প্রশাসন। ৩৯১টি অভিযান পরিচালনা করে ১৯১টি মামলায় ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৭০ টাকা অর্থদন্ড আরোপ করা হয়। এ সময় সাতক্ষীরা জেলায় একজনকে দু’মাসের, চাঁদপুর জেলায় একজনকে এক বছর, গাজীপুর জেলায় একজনকে একমাসের কারাদÐ দেওয়া হয়েছে।
৬৪ জেলা থেকে অবৈধভাবে মজুতকৃত ডিজেল ৬৭,৪০০ লিটার, অকটেন ৬,৪৪৪ লিটার এবং পেট্রোল ১৩,৮৫৬ লিটার জ্বালানি উদ্ধার হয়েছে।



