রুক্ষতার মাঝে রঙের উৎসব কৃষ্ণচূড়া

বৈশাখি রোদ্দুরে তপ্ত দুপুরের ক্লান্তি মুছে দিতে এক পশলা আগুনের ঝলক নিয়ে হাজির হয় যে ফুল তার নাম কৃষ্ণচূড়া। বাঙালির প্রকৃতি, প্রেম এবং দ্রোহের সাথে এই ফুলের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়।

পহেলা বৈশাখ আর কৃষ্ণচূড়া যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কৃষ্ণচূড়া মানেই যেনো রুক্ষতার মাঝে রঙের উৎসব। কৃষ্ণচূড়া শেখায় প্রতিকূল পরিবেশেও কীভাবে নিজের শ্রেষ্ঠ রূপটি মেলে ধরতে হয়। বৈশাখের তপ্ত দুপুরে একফালি ছায়া আর একরাশ লাল রঙ নিয়ে কৃষ্ণচূড়া বেঁচে আছে প্রকৃতি আর সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে।

যখন চারদিকে প্রখর দাবদাহে প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে ওঠে, তখনই নিজের সবটুকু রঙ উজার করে দিয়ে ফোটে কৃষ্ণচূড়া। সত্যিই তো, মেহগনি বা অর্জুনের সারির মাঝে যখন একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়ায়, মনে হয় যেন গ্রীষ্মের ললাটে রক্তিম টিপ।

গাছের মাথায় আগুন লেগেছে! বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষের সাথে প্রকৃতির এক গভীর মিতালি রয়েছে যেনো। এই সময়ে চারপাশ রঙিন করে যে ফুল ফোটে, তাদের মধ্যে অন্যতম কৃষ্ণচূড়া। বৈশাখের তপ্ত দুপুরে আগুনের মতো লাল কৃষ্ণচূড়া সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।

তাই একে বৈশাখের রাজকীয় ফুলও বলা যায়। এই রাজকীয় ফুল নিয়ে বাংলা সাহিত্যে প্রশংসার শেষ নেই। সাহিত্যে কৃষ্ণচূড়া কখনো বিদ্রোহের প্রতীক, কখনো বা বিরহের।

কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি কর্ণে / আমি ভুবন ভোলাতে আসি গন্ধে ও বর্ণে’, রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘গন্ধে উদাস হাওয়ার মতো উড়ে তোমার উত্তরী/ কর্ণে তোমার কৃষ্ণচূড়ার মঞ্জরি।’

নাগরিক কবি শামসুর রাহমান লিখেছেনÑ‘আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে/ কেমন নিবিড় হ’য়ে।
কৃষ্ণচূড়ার চোখধাঁধানো রূপ আমাদের বাংলার প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে হলেও, এর আদি জন্মভূমি কিন্তু বাংলা বা ভারত নয়। কৃষ্ণচূড়ার আদি জন্মভূমি হলো আফ্রিকা মহাদেশের মাদাগাস্কার দ্বীপ। এটি ওই দ্বীপের পশ্চিম উপকূলীয় বনাঞ্চলের একটি স্থানীয় গাছ।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সারা বিশ্বে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও মাদাগাস্কারের আদিবাসীদের কাছে এই গাছটি অত্যন্ত সম্মানের। সেখানে একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, এই গাছটি প্রকৃতির এমন এক প্রহরী যা গ্রামকে অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে। যেহেতু এটি খরাতেও বেঁচে থাকে, তাই একে ‘অমরত্বের প্রতীক’ হিসেবেও দেখা হয়।

কৃষ্ণচূড়া মূলত ক্রান্তীয় বা ট্রপিক্যাল অঞ্চলের গাছ। এই কারণেই বাংলাদেশ, ভারত, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটি খুব সহজে মানিয়ে নিয়েছে। ঠিক কবে এই গাছটি বাংলায় এসেছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তারিখ নেই, তবে ধারণা করা হয় ইউরোপীয় বণিক বা ব্রিটিশদের হাত ধরে শোভাবর্ধক বৃক্ষ হিসেবে এটি এই অঞ্চলে প্রবেশ করে।

কৃষ্ণচূড়া কেবল তার রঙের জন্যই নয়, বরং তার টিকে থাকার ক্ষমতার জন্য পরিচিত। এটি চরম খরা সহ্য করতে পারে এবং লবণাক্ত মাটিতেও জন্মাতে সক্ষম, যা একে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য উপযোগী করে তুলেছে। কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া কিন্তু এক গাছ নয়। রাধাচূড়া আকারে অনেক ছোট এবং গুল্মজাতীয় হয়, যেখানে কৃষ্ণচূড়া একটি বিশাল আকৃতির বৃক্ষ।

কৃষ্ণচূড়া নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রাচীন ‘পৌরাণিক’ কাহিনী না থাকলেও, এটি ঘিরে বেশ কিছু চমকপ্রদ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচলিত আছে। এর আদি জন্মভূমি মাদাগাস্কার হওয়ায় এর অধিকাংশ লোকগাথা সেই অঞ্চল বা খ্রিস্টীয় সংস্কৃতির সাথে জড়িত।

ইউরোপীয় এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে একটি লোককথা প্রচলিত আছে যে, যিশু খ্রিস্টকে যখন ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, তখন ক্রুশের নিচে একটি ছোট সবুজ গাছ ছিল। যিশুর শরীর থেকে ঝরে পড়া রক্ত সেই গাছের ফুলের ওপর পড়েছিল।

বলা হয়, সেই পুণ্য রক্তের ছোঁয়াতেই এই ফুলের রঙ চিরকালের জন্য এমন প্রদীপ্ত লাল হয়ে যায়। এই কারণেই অনেক দেশে একে ‘ক্রিস্ট ব্লাড’ বা খ্রিস্টের রক্ত বলা হয়।

ভারতবর্ষে এই ফুলের নাম ‘কৃষ্ণচূড়া’ হওয়ার পেছনে কোনো লিখিত শাস্ত্রীয় প্রমাণ নেই, তবে একটি জনশ্রুতি বা লোকজ বিশ্বাস রয়েছে। বলা হয়, এই ফুলের উজ্জ্বল লাল-কমলা রঙ কৃষ্ণের মাথার মুকুটের চূড়ার মতো দেখতে, তাই এর নাম ‘কৃষ্ণচূড়া’।

আবার এর হলুদ ভেরিয়েশনকে বলা হয় ‘রাধাচূড়া’। ভক্তদের বিশ্বাস, কৃষ্ণ ও রাধার প্রেমের উজ্জ্বলতা ও দহন এই দুই ফুলের রঙের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন অন্য সব গাছ শুকিয়ে যায়, তখন কৃষ্ণচূড়া তার সর্বশক্তি দিয়ে জেগে ওঠে, যা মূলত বিরহ ও প্রেমের শক্তির প্রতীক।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments