উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক নির্বাহী স¤পাদক বৃহত্তর সিলেটের কৃতি সন্তান হাসান শাহরিয়ারের আজ ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনে (১০ এপ্রিল) তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঘরোয়া পরিবেশে মরহুমের নিজ বাড়ী সুনামগঞ্জে, ঢাকার সেগুনবাগিচা এপার্টম্যান্ট ও সিলেটে দোয়া মাহফিল অনুষ্টিত হবে।
হাসান শাহরিয়ার সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংবাদ সাময়িকী নিউজ উইক’, পাকিস্তানের ‘দি ডন’, মধ্যপ্রাচ্যের ‘খালিজ টাইমস’, চট্টগ্রামের ডেইলি পিপলস ভিউ-এর প্রধান স¤পাদক ও দক্ষিণ ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘ড্যাকান হেরাল্ড’-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেছেন।
আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান বিষয়ক একজন বিশ্লেষক হিসেবে হাসান শাহরিয়ার দেশে-বিদেশে সমাদৃত ছিলেন। বৈদেশিক সংবাদদাতা সমিতি ওকাব-এর সাবেক সভাপতি, কমনওয়েলথ জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন (সিজেএ)-এর ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস ছিলেন হাসান শাহরিয়ার।
একমাত্র তিনিই এশিয়া-প্যাসিফিকের প্রথম সাংবাদিক ছিলেন, যিনি গত ২০০৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় এই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে মালয়েশিয়ার কুচিং-এ অনুষ্ঠিত সিজেএ সম্মেলনে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এ সময়ও তার কোনো প্রতিদ্বন্ধি ছিল না।
২০১২ সালে মাল্টা সম্মেলনে তিনি ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস নির্বাচিত হন। সাংবাদিকতায় অনন্য অবদানের জন্য বাংলা একাডেমী তাকে ফেলোশীপ প্রদান করে। তিনি ‘অতীত অতীত নয়’, ‘যার শেষ ভালো তার সব ভালো।’ ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’ ও নিউজ উইক-এ বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় এবং অতঃপর’ শীর্ষক বই লিখে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল তাকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করেছে।
শাহরিয়ার একজন নির্ভীক সাংবাদিক হিসেবে বহুপ্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও ন্যায় ও সত্যের পথ বেছে নিয়ে তিনি সাংবাদিকতা পেশাকে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করছেন। নীতির প্রশ্নে তিনি কখনো আপোস করেননি। এ জন্যে তিনি কয়েকবার চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছেন। স¤পাদকের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে একটি প্রকাশিতব্য ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার স¤পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
হাসান শাহরিয়ারের জীবন-কাহিনী বর্ণাঢ্য ও সফল। তাঁর জন্ম বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ শহরের হাছন নগরে, ১৯৪৬ সালের ২৫ এপ্রিল। অবশ্য তাঁর পারিবারিক নিবাস তাহিরপুর থানার লাউড় পরগনার বিন্নাকুলি গ্রামে। পিতা মকবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন তদানীন্তন আসামের প্রথম মুসলিম স¤পাদক।
তিনি কলকাতার দৈনিক ‘ছোলতান’, সিলেটের সাপ্তাহিক যুগবাণী, যুগভেরী ও সিলেট পত্রিকা স¤পাদনা করেন। তিনি ছিলেন খেলাফত নেতা, আসাম ব্যবস্থাপক সভার সদস্য (এমএলএ) ও ভাষা সৈনিক। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সাংবাদিকতার পথে এগিয়ে আসেন হাসান শাহারিয়ার।
হাসান শাহরিয়ার সুনামগঞ্জ সরকারী জুবিলী হাই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন বা প্রবেশিকা, সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে আই,এ এবং করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি,এ (অনার্স) ও এম,এ ডিগ্রী লাভ করেন। স্কুল জীবন থেকেই হাসান শাহরিয়ারের প্রতিভা বিকশিত হতে শুরু করে এবং সাহিত্য ও সাংবাদিকতার দিকে তিনি ঝুঁকে পড়েন।
তিনি স্কুল বার্ষিকীর স¤পাদনা করেন। প্রগতিশীল সাংবাদিক ও সমাজ সেবক মুহাম্মদ আব্দুল হাই-এর স¤পাদনায় সুনামগঞ্জ থেকে ‘সুরমা’ নামের পত্রিকায় তাঁর সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি। ছাত্রাবস্থায় তিনি ছিলেন একজন কর্মঠ স্কাউট এবং শিশু কিশোর সংগঠন কচি-কাঁচার মেলার একজন দক্ষ সংগঠক।
তিনি ছিলেন সুরমা-কাকলী কচি-কাঁচার মেলার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৬৩ সালে বন্যার্তদের সাহায্যের জন্য কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার পক্ষ থেকে পরিচালক রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই)-এর নেতৃত্বে যে প্রতিনিধিদল চট্টগ্রাম গিয়েছিল তিনি তার অন্যতম সদস্য ছিলেন।
১৯৬৩ সালে রিয়াসত আলী ও দৈনিক ইত্তেফাক-এর তদানীন্তন মফস্বল স¤পাদক ও কচি-কাঁচার আসরের পরিচালক রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই)-এর চেষ্টায় ইত্তেফাক এর বার্তা স¤পাদক শহীদ সিরাজউদ্দিন হোসেন তাকে সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা নিয়োগ করেছিলেন।



