বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে হঠাৎ করে জ্বালানি তেল নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। অকটেন ও পেট্রোল সরবরাহ বন্ধ রাখতে ১০ দিন আগে বিপিসি চিঠি দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিপাকে পড়েছে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, ডিপোগুলোতে অকটেন রাখার কোনো জায়গা নেই। রীতিমতো উপচে পড়ার মতো অবস্থা। এজন্য সরকার দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অকটেন- পেট্রোল নেওয়া বন্ধ করেছে।
সূত্র জানায়, দেশে পেট্রোল ও অকটেনের মোট চাহিদার ৭৫ ভাগ পূরণ করে থাকে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। বেসরকারি চারটি এবং সরকারি একটিসহ মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠান এ চাহিদার জোগান দিয়ে থাকে। প্রতিমাসে দেশে অকটেন ও পেট্রোলের প্রয়োজন হয় ৭৫ হাজার টন।
এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক বা ৪০-৪৫ ভাগ চাহিদা পূরণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি। এই প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে বেশি চাহিদা পূরণ করে। অথচ সরবরাহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে ৮ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি দিয়েছে বিপিসি।
জানা গেছে, দেশে অকটেন মজুতের ক্ষমতা ৫৩ হাজার টন। এখন আছে প্রায় ৫৫ হাজার টন। তবে ১০ এপ্রিল ৩৭ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ আসার পর আরও বিপাকে পড়েছে বিপিসি।
এদিকে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের কাছ থেকে অকটেন-পেট্রোল নেওয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রণব কুমার সাহা বিপিসির চেয়ারম্যানকে ১৬ এপ্রিল চিঠি দেন।
এতে বলা হয়, ৫ এপ্রিল বিপিসির সঙ্গে বৈঠকে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের কাছ থেকে এপ্রিলে ৩৭ হাজার টন পেট্রোল-অকটেন এবং ৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে বলা হয়। সেভাবে তারা প্রস্তুতিও নেয়। কিন্তু ৮ এপ্রিল থেকে বিতরণ কোম্পানিগুলো অকটেন-পেট্রোল নিচ্ছে না।
এতে দেশীয় এ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কারণ, সুপারপেট্রোর তিনটি ট্যাংকার উপচে পড়ছে। অথচ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে বারবার বলা হলেও তারা তেল নিচ্ছে না।
এ ব্যাপারে প্রণব কুমার সাহা বলেন, ফেব্রুয়ারিতে অকটেনের একটি জাহাজ আসার পর বিপিসি তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তেল নেয়নি। যে কারণে মার্চে বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এখন আবার অকটেনের একটি জাহাজ আসার সঙ্গে সঙ্গে একই কাজ করছে বিপিসি।
তিনি বলেন, অকটেন-পেট্রোল তৈরির কাঁচামাল নিয়ে ২০ এপ্রিল সুপারপেট্রোর একটি জাহাজ আসবে। সেটি নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি। কারণ, ট্যাংক খালি না হলে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, প্রতিমাসে অকটেন ও পেট্রোলের চাহিদা ৭৫ হাজার টন। চলতি মাসে অকটেন-পেট্রোল এসেছে ৬০ হাজার মেট্রিক টনের কিছু বেশি এবং এ মাসে আরও আসবে ১ লাখ ২০ হাজার টনের বেশি। ফলে এ তেল রাখার আর জায়গা নেই। এজন্য গত মাসে সব বিতরণ কোম্পানিকে বলা হয় কেরোসিনের কয়েকটি ডিপোতে অকটেন রাখার জন্য। কিন্তু তারা এখনো সে ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, কেরোসিনের ট্যাংকগুলো অকটেনের জন্য সময়মতো প্রস্তুত করতে পারেনি বিতরণ কোম্পানিগুলো। মূলত এ কারণে জনগণ এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে মাশুল দিতে হচ্ছে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, বিশ্ববাজারে অকটেন এবং ডিজেলের দাম অনেকটা দ্বিগুণ। এখন বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির ফলে চাহিদামতো অকটেন-ডিজেল কিনতে আগ্রহী নয় বিপিসি। যা কেনা হচ্ছে, তাতেও সরকারের এখনো প্রতিদিন শতকোটি টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে দৈনিক গড়ে ১২ হাজার ৭৭৭ টন ডিজেল, ১ হাজার ৪৯৬ টন পেট্রোল, ১ হাজার ১৯৩ টন অকটেন সরবরাহ করে তিন বিতরণ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা। ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর ৭ মার্চ পর্যন্ত ইচ্ছামতো তেল বিক্রি করে ওই তিন কোম্পানি। এরপর ৮ মার্চ থেকে রেশনিং শুরু করে সরকার।
বিতরণ কোম্পানিকে এক নির্দেশনায় বলা হয়, ২০২৫ সালের একই তারিখের তেলের চাহিদার চেয়ে ১০ শতাংশ কম তেল পাবে সংশ্লিষ্ট পাম্প এবং ডিলাররা।
গত ঈদের তিন দিন আগে বিপিসির আরেক নির্দেশনায় বলা হয়, তেল বিতরণে কোনো রেশনিং থাকবে না। কিন্তু গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি তেল দেওয়া যাবে না। এ অবস্থায় জনমনে আতঙ্ক ও মজুতদারির প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় পাম্পের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে বলে মনে করেন সরকারি কর্মকর্তারা।
অবশ্য দেশের স্থানীয় প্রতিষ্ঠান থেকে অকটেন কেনা বন্ধ করায় এবং বর্তমান মজুত উপচে পড়ার মতো অবস্থা হওয়ায় সাধারণ মানুষ বিপিসির এমন তথ্য এখন আর বিশ্বাস করতে চাইবে না।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহীরুল হাসান বলেন, অকটেন রাখার আর কোনো জায়গা নেই। তাই অল্প অল্প করে বেসরকারি কোম্পানির কাছ থেকে তেল নেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি পরিকল্পনায় পরিপক্বতার যথেষ্ট ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। যেখানে চাহিদার একটা বড় অংশ পরিমাণ অকটেন-পেট্রোল দেশে উৎপাদন হয়-সেখানে পাম্পের সামনে মানুষকে কেন ঘণ্টার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। তার মানে হচ্ছে, সরকারের সাপ্লাই চেইনে কোনো সমস্যা আছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, স্থানীয় উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে জ্বালানি তেল কেনা উচিত।


