সীমান্তে একজন মানুষ মারা যান। বাংলাদেশের পত্রিকায় সেটি হয় ‘বিএসএফের গুলিতে নিহত বাংলাদেশি’। ভারতের পত্রিকায়, যদি আদৌ সংবাদ হয়, সেটি হয় ‘অনুপ্রবেশকারী নিহত’ অথবা ‘সন্দেহভাজন পাচারকারীর মৃত্যু’। একই মানুষ, একই ঘটনা, একই সীমান্ত; কিন্তু দুই দেশের পাঠকের সামনে হাজির হয় দুই ভিন্ন বাস্তবতা। এই বিভাজন কেবল ভাষার নয়, এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সাংবাদিকতার মধ্যকার জটিল সম্পর্কের প্রতিফলন। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত আজ শুধু ভূখণ্ডের সীমারেখা নয়, এটি একটি তীব্র ন্যারেটিভ যুদ্ধের ময়দান।

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই ন্যারেটিভ যুদ্ধ আরও স্পষ্ট ও আক্রমণাত্মক হয়েছে। সীমান্ত এখন আর কেবল দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ‘ডিটেক্ট, ডিটেইন অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক স্লোগান থেকে রাষ্ট্রীয় ভাষায় পরিণত হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধন, নাগরিকত্ব বিতর্ক এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে প্রশাসনিক তৎপরতা মিলিয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে সীমান্তের মানুষের বহুস্তরীয় পরিচয় সংকুচিত হয়ে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’, ‘নিরাপত্তা হুমকি’ কিংবা ‘জনসংখ্যাগত ঝুঁকি’র মতো তকমায় আবদ্ধ হচ্ছে।
এই ভাষার রাজনীতি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে ‘পুশ-ইন’ এবং ‘রিপ্যাট্রিয়েশন’ শব্দদ্বয়ের ব্যবহারে। বাংলাদেশ যাকে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে মানুষকে জোরপূর্বক সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হিসেবে বর্ণনা করে, ভারতীয় মিডিয়ার একটি বড় অংশ সেটিকেই ‘বৈধ প্রত্যাবাসন’ হিসেবে উপস্থাপন করে। ফলে একই ঘটনার নৈতিক ও আইনি ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। একটি ভাষা মানবাধিকারের প্রশ্ন তোলে, অন্যটি প্রশাসনিক বৈধতার যুক্তি প্রতিষ্ঠা করে।
ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ বাংলাদেশ সীমান্তের মানবিক সংকট নিয়ে প্রায় নীরব। সীমান্তে গুলিতে মৃত্যু, পুশ-ইনের অভিযোগ কিংবা কাঁটাতারের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পরিবারের গল্প দিল্লির জাতীয় সংবাদ এজেন্ডায় খুব কমই জায়গা পায়। পাকিস্তানকেন্দ্রিক নিরাপত্তা রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণের ভিড়ে বাংলাদেশ সীমান্ত অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু এই নীরবতা নিরপেক্ষ নয়। সাংবাদিকতায় কী বলা হচ্ছে না, সেটিও জনমত গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে বিএসএফ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ভাষ্য প্রায় বাধাহীনভাবে জনপরিসরে আধিপত্য বিস্তার করে।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, পুশ-ইন এবং মানবিক বিপর্যয়কে দৃশ্যমান করেছে, নিঃসন্দেহে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কিন্তু দৃশ্যমানতা আর অনুসন্ধানী গভীরতা এক বিষয় নয়। সীমান্ত সাংবাদিকতার বড় দুর্বলতা হলো এর ঘটনাকেন্দ্রিক চরিত্র। একটি মৃত্যু বা একটি পুশ-ইন তাৎক্ষণিক শিরোনাম হয়; কিন্তু তার নেপথ্যের কাঠামোগত বাস্তবতা খুব কমই অনুসন্ধানের বিষয় হয়। কেন নির্দিষ্ট কিছু সীমান্তপথ বারবার একই ধরনের ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে, সীমান্তবর্তী অর্থনীতি, চোরাচালান নেটওয়ার্ক, স্থানীয় রাজনৈতিক স্বার্থ কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতা কতটা ভূমিকা রাখছে, সেই প্রশ্নগুলো প্রায়ই অমীমাংসিত থেকে যায়। সংবাদ প্রকাশিত হয়, জনমত উত্তপ্ত হয়, তারপর ঘটনাটি হারিয়ে যায় পরবর্তী ঘটনার ভিড়ে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনি ভাষার ব্যবহারেও একটি ঘাটতি লক্ষ করা যায়। ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ বা ‘সার্বভৌমত্বের অবমাননা’ শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়, কিন্তু সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তির আলোচনা প্রায় অনুপস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, জোরপূর্বক পুশ-ইনের প্রশ্ন মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত চলাচলের স্বাধীনতা এবং ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আশ্রয় প্রার্থনার অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। একইভাবে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন এবং নন-রিফুলমেন্ট নীতি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে এমন স্থানে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো যায় না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই আইনি ভিত্তি উপস্থাপন না করলে সংবাদ জাতীয় আবেগ সৃষ্টি করলেও আন্তর্জাতিক পরিসরে কার্যকর নথিভিত্তিক অবস্থানে রূপ নিতে পারে না। আধুনিক তথ্যযুদ্ধে শুধু সত্য বলা যথেষ্ট নয়; সেই সত্যকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ভাষায় উপস্থাপন করাও সমান জরুরি।
আরেকটি সমস্যা হলো ধারাবাহিক অনুসরণমূলক সাংবাদিকতার অভাব। কোনো পরিবার সীমান্তে আটকে পড়লে বা পুশ-ইনের শিকার হলে সেটি কয়েক দিনের সংবাদ হয়। কিন্তু পরে কী ঘটল, কূটনৈতিক আলোচনার ফল কী হলো, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা বা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো কী অবস্থান নিল, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার প্রবণতা দুর্বল। ফলে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবেই থেকে যায়, রাষ্ট্রীয় নীতি পরিবর্তনের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবেগীয় জাতীয়তাবাদের প্রভাব। দুই দেশেই সীমান্ত-সংক্রান্ত সংবাদ প্রায়ই ‘আমরা বনাম তারা’ কাঠামোয় উপস্থাপিত হয়। এতে সীমান্তবাসীর বাস্তব জীবন আড়ালে চলে যায়। অথচ সীমান্তের মানুষের কাছে ভূরাজনীতির চেয়ে জীবিকা, চিকিৎসা, পরিবার এবং প্রতিদিনের নিরাপত্তা অনেক বেশি বাস্তব প্রশ্ন।
উদ্বেগের আরেকটি ক্ষেত্র হলো বাংলাদেশের কিছু অনলাইন সংবাদমাধ্যমের আচরণ। পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই বা প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ ছাড়া ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন হুবহু পুনঃপ্রকাশের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। এর ফলে অনেক সময় ভারতীয় রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাকেন্দ্রিক বয়ান অনিচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের তথ্যপরিসরেও প্রবেশ করে। আন্তর্জাতিক সংবাদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় যাচাই, উৎস মূল্যায়ন এবং প্রেক্ষাপট সংযোজনের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হওয়া জরুরি। অন্যথায় বিদেশি সংবাদসূত্রের দৃষ্টিভঙ্গিই ধীরে ধীরে আমাদের নিজস্ব তথ্যপরিসরের অংশ হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতায় সীমান্ত সাংবাদিকতাকে আরও পরিণত হতে হবে। সরকারি বিবৃতির বাইরে সীমান্তবাসী, মানবাধিকার গবেষক, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং দুই দেশের স্বাধীন সাংবাদিকদের কণ্ঠকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সীমান্তের দুই পাশের বাস্তবতা নিয়ে যৌথ অনুসন্ধান, তুলনামূলক সংবাদ বিশ্লেষণ এবং তথ্যনির্ভর গবেষণা এই ন্যারেটিভ সংঘাতকে আরও বস্তুনিষ্ঠ করতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্তের মানবিক সংকটের সুনির্দিষ্ট নথিভুক্তি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
আজকের পৃথিবীতে সীমান্ত কেবল কাঁটাতার বা সশস্ত্র প্রহরায় নিয়ন্ত্রিত হয় না; এটি নিয়ন্ত্রিত হয় ভাষা, সংবাদ এবং ডিজিটাল জনমতের মাধ্যমেও। যে পক্ষ তার বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সে অনেক সময় ঘটনার নৈতিক ব্যাখ্যাও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।
তথ্যযুদ্ধে পরাজয় মানে শুধু সংবাদ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া নয়; এর অর্থ হলো সীমান্তের প্রান্তিক মানুষের কষ্ট, অন্যায্য মৃত্যু এবং নীরব সংগ্রামের গল্পগুলো ইতিহাসের প্রান্তে হারিয়ে যাওয়া। ভারতীয় মিডিয়ার নীরবতা যদি একটি সংকট হয়, তবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সামনে চ্যালেঞ্জ হলো আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়ার বাইরে গিয়ে তথ্য, আন্তর্জাতিক আইন এবং অনুসন্ধানী গভীরতার ওপর দাঁড়িয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ন্যারেটিভ নির্মাণ করা। কারণ সীমান্তের সত্যকে টিকিয়ে রাখার লড়াই শেষ পর্যন্ত শুধু কূটনীতির নয়, পেশাদার সাংবাদিকতারও।
লেখক: সাঈফ ইবনে রফিক, কবি ও সাংবাদিক



