রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এক সময়ের প্রভাবশালী শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়া একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী এখন প্রকাশ্যে চলাফেরা কমিয়ে দিয়েছেন। অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন, আবার কেউ কেউ নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করছেন।
সা¤প্রতিক সময়ে একের পর এক আলোচিত সন্ত্রাসী হত্যাকাÐকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সর্বশেষ রাজধানীর রামপুরা এলাকায় আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশ গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় অপরাধ জগতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণের সামনে জামিনে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। কয়েকদিন আগে আরেক আলোচিত সন্ত্রাসী টিটনও দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন হত্যাকাÐ নয়; বরং পুরনো আধিপত্য, আর্থিক স্বার্থ, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিশোধের রাজনীতির জটিল সমীকরণও এর পেছনে কাজ করতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, জামিনে মুক্তি পাওয়া অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী এখন আর আগের মতো নিজ এলাকায় অবস্থান করছেন না। কেউ দেশের বিভিন্ন জেলায় আত্মগোপন করে আছেন, আবার কেউ সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান বদল করছেন। অনেকে মোবাইল ফোন ব্যবহার সীমিত করে ফেলেছেন এবং পরিচিত সহযোগীদের সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছেন।
৫ আগষ্টের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী ফ্রিডম রাসু, আরমান, সানজিদুল ইসলাম ইমন, আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, আসলাম, কাইল্যা সোহেলসহ শতাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সবাই আত্মগোপনে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশে আত্মগোপন করেছেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ঘোষণা দেয়ার পর অজানা আতংকে আত্মগোপন করেন।
পুলিশের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সা¤প্রতিক হত্যাকাÐগুলোর পর অনেকেই নিজেদের টার্গেট মনে করছেন। ফলে তারা প্রকাশ্যে আসতে ভয় পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে বের হওয়া অনেক সন্ত্রাসীর পুরনো নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে গেছে। এ সময় নতুন গ্রæপ এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। ফলে পুরনো বিরোধ আবার সামনে আসছে।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি, প্রতিদ্ব›দ্বী গ্রæপের হামলার আশঙ্কা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল—সব মিলিয়ে তারা চাপে রয়েছেন।
বদলে গেছে জীবনযাপনঃ
এক সময় যারা বহর নিয়ে চলাফেরা করতেন, তাদের অনেকেই এখন সাধারণ পোশাকে সীমিত সংখ্যক সহযোগী নিয়ে চলছেন। কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদেরও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
অপরাধ সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী নিয়মিত বাসা পরিবর্তন করছেন। একই স্থানে টানা কয়েকদিন অবস্থান না করার কৌশলও নিয়েছেন তারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, জামিনে মুক্তি পাওয়া আলোচিত সন্ত্রাসীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা অস্ত্রভিত্তিক অপরাধে পুনরায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রæত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক কর্মকর্তা বলেন, কেউ জামিনে মুক্তি পেলেই তিনি অপরাধমুক্ত হয়ে যান না। তাদের কর্মকাÐ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
মামুন হত্যা, টিটন হত্যা এবং কাইল্যা পলাশের ওপর হামলার মতো ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাজধানীর অপরাধ জগতে নতুন করে ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে এক সময়ের প্রভাবশালী অনেক সন্ত্রাসী এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি চিন্তিত। ফলে জামিনে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বড় একটি অংশ প্রকাশ্যে না এসে আত্মগোপনে থাকাকেই আপাতত নিরাপদ মনে করছেন। তবে একের পর এক হামলার ঘটনায় তাদের মধ্যে যে গভীর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা অপরাধ জগতের অন্দরে নতুন অস্থিরতার বার্তাই দিচ্ছে।
কাইল্যা পলাশ সঙ্কটাপন্ন, থানায় মামলাঃ
রাজধানীর রামপুরা টিভি সেন্টার এলাকায় ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে ‘ক্যাইল্যা’ পলাশকে গুলির ঘটনায় গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। এ ঘটনায় তার স্ত্রী বাদী হয়ে হাতিরঝিল থানায় একটি মামলা করেছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূর্ব শক্রুতার জের ধরে প্রতিপক্ষ ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’র ক্যাডার বাহিনী তাকে আগে থেকে অনুসরণ করে ‘টার্গেটে রেখে’ গুলি চালায়। দীর্ঘ কারাবাসের পর জামিনে থেকে সে এলাকায় নিজের পরনো সহযোগীদের একত্র করে এলাকায় দাপটের সঙ্গে অবস্থানের চেষ্টা করছিল। এরই মধ্যে তাকে একাধিক ফোনে হুমকিও দেওয়া হয়।
হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান গতকাল সন্ধ্যায় এ তথ্য দেন। তিনি বলেন, মামলায় অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ এর তথ্য সংগ্রহ করে তার উপর গুলি চালানো সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ওসি বলেন, গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি পলাশ রামপুরা এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এলাকায় তিনি পলাশ ওরফে ‘কাইল্ল্যা পলাশ’ নামে পরিচিত। তার ঘনিষ্ঠরা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপরাধ মুলক কর্মকাÐে জড়িত বলে তথ্য রয়েছে।
পলাশকে পূর্ব শক্রুতার জেরে গুলি করা হতে পারে জানিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন কারাবাসের পর একমাস আগে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান পলাশ। ২০০২ সালের ২৯ মে রামপুরায় যুবদল নেতা মিজানকে গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনায় বিচারিক আদালত মৃত্যুদÐ দিয়েছিলেন পলাশকে। পরে উচ্চ আদালত তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদÐ দেন।
পলাশের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা না থাকায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি জানিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ অন্তত দশটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে কারা তাকে গুলি করেছে তার তদন্ত চলছে জানিয়ে পুলিশ বলছে, রাজধানীর মতিঝিল, রামপুরাসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় তার প্রতিপক্ষ একটি বড় সন্ত্রাসী গ্রæপ রয়েছে। ওই গ্রæপের সঙ্গে আগে থেকেই বিরোধ ছিল পলাশের। এ গ্রæপের সদস্যরা এক শীর্ষর নিয়ন্ত্রণে চলে। তাদের রয়েছে একাধিক ক্যাডার বাহিনী। তারা দীর্ঘদিন ধরে পলাশকে অনুসরণ করে আসছিল। তারাই তার উপর .হামলায় জড়িত থাকতে পারে।
বর্তমান চিকিৎসার অবস্থা ঃ গুলিবিদ্ধ পলাশ বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। চিকিৎসকদের ভাষ্য, পলাশের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক। গুলিটি কপাল দিয়ে প্রবেশ করে মস্তিষ্কে আঘাত হেনে মাথার অপর পাশে আটকে ছিল।
এতে মস্তিষ্কের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ব্রেনে ফুলে গেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসকরা মাথার খুলি খুলে জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন।
নিউরোসার্জারি বিভাগের রেসিডেন্ট ট্রেইনি চিকিৎসক ডা. তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অস্ত্রোপচারের সময় তার মাথার ভেতর থেকে এক রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মস্তিষ্কের প্রায় অর্ধেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।



