রাজধানীর কাঁটাবনের আল-বারাকা টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে দগ্ধ হয়ে দুই জন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন মো. জনি (২৪) ও মো. আব্দুস সালাম (২০)। তারা দুজনই আইন পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ওই ভবনের ১২ তলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল নোমানের চেম্বার। একই ফ্লোরে সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফের ছেলে ব্যারিস্টার মোয়াজের চেম্বার। জনি ও সালাম কর্মস্থলের সুবিধার্তে চেম্বারেই রাত যাপন করতেন। আর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আগুন ১২ তলায় আইনজীবীর চেম্বার থেকে সূত্রপাত হয়ে ১৩ তলায় ডি-১ ফ্ল্যাটে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ফ্ল্যাটে লিডার্স নামে এনজিও’র অফিস ছিল।
অগ্নিকান্ডে ১২ তলায় আইনজীবীদের চেম্বারের সকল কাগজপত্র, কম্পিউটার, বই ও আসবাবপত্র পুড়ে ভস্মীভ‚ত হয়ে গেছে। অগ্নিকান্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে তদন্ত শুরু করেছে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, ১৫২, এ্যলিফেন্ট রোডের ১৪ তলা আবাসিক ভবনটির নাম আল বারাকা টাওয়ার। ভবনটিতে ৮৮ টি ফ্ল্যাট। আবাসিক ফ্ল্যাটের মধ্যে বেশ কিছু ফ্ল্যাটে অফিসও রয়েছে। শুক্রবার রাত ১টা ৫ মিনিটের দিকে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। প্রথমে পলাশী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে একটি ইউনিট গিয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। এর মধ্যে আগুন ১২ তলার ফ্ল্যাট থেকে ওপরের দিকে ১৩ তলার ফ্ল্যাটে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিটের প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত ৩টা ৮ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক কাজী নজিমুজ্জামান বলেন, ১২ তলায় একটি অফিস থেকে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় দুই জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। উদ্ধার করা জনিকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এবং আব্দুস সালামকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তবে আইনজীবীদের চেম্বারের সকল কিছু পুড়ে গেছে। আগুনের তাপে ওপরের ১৩ তলার একটি ফ্ল্যাটে আগুন ধরে যায়। সেখানে একটি এনজিও অফিসের পাশাপাশি আবাসিক ফ্ল্যাটও রয়েছে।
স্বজন ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিহত জনির বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বাবুন্দিয়া গ্রামে। তিনি বাবুল মিয়ার ছেলে এবং সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফের ছেলে ব্যারিস্টার মোয়াজের অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
অপরদিকে আব্দুস সালামের বাড়ি বগুড়ার কাহালু উপজেলার বড় ভাদাহার এলাকায়। তিনি সেলিম সরকারের ছেলে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল নোমানের অফিস সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। কর্মস্থলের সুবিধার্থে তারা আল-বারাকা টাওয়ারেই বসবাস করতেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গভীর রাতে আগুন লাগার পর মুহূর্তেই ভবনের বিভিন্ন তলায় ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। এতে বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। অনেকেই ছাদ ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। পরে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ভবনে আটকে পড়াদের নিরাপদে বের করে আনেন।
জনি-সালামের শেষ আর্তনাদঃ
‘ভাই, আমাদের যেভাবে পারেন বাঁচান। বাসায় আগুন লাগছে।’ পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা নাজমুলকে ফোনকলে শেষবার এভাবে আকুতি জানিয়েছিলেন জনি ও সালাম।
নাজমুলের মামা মো. নবীর হোসেন গত ২৪ বছর ধরে ওই ভবনে বাস করছেন। আগুন লাগার মাত্র ৩০ মিনিট আগেও তিনি, তার ভাগ্নে নাজমুল এবং নিহত জনি ও আবদুস সালাম একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছেন। গল্প করেছেন। এরপর জনি ও সালাম মোবাইলে বিশ্বকাপ খেলা দেখার কথা বলে নিজেদের ফ্ল্যাটে দরজা আটকে শুয়ে পড়েন।
নিজের রুমে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন নবীর হোসেন। এর কিছুক্ষণ পরই ভাগ্নে নাজমুল চিৎকার করতে করতে তাকে এসে ডেকে তোলেন। নাজমুল জানান, ওপাশ থেকে জনি ও সালাম ফোন করে বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছে।
দরজা ভেঙেও শেষ রক্ষা হয়নি ঃ
‘দরজা খুলে বের হয়ে দেখি পুরো ফ্ল্যাটে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। আমি আর ভাগ্নে দুজন মিলে ওদের ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙেছি। দরজা ভাঙতেই আগুনের ফুলকি বের হয়ে এলো। পানি এনে ঢালছিলাম। কিন্তু আগুন কমছিল না। ধোঁয়ায় কিছু দেখতেও পারছিলাম না। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তারপরও তাদের উদ্ধার করতে আগুনের মাঝে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু পরিবার আমাকে টেনে সরিয়ে নেয়, বলছিলেন নবীর হোসেন।
তিনি আরও বললেন, ‘তাদের বাঁচাতে অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারলাম না। ফায়ার সার্ভিস যদি আর একটু আগে আসত, তাহলে হয়তো তাদের বাঁচানো যেত।’
প্রাণ বাঁচাতে বাথরুমে আশ্রয় নেন দুজন ঃ
ভবনটির গার্ড মো. শরীফ জানান, আগুন থেকে বাঁচতে জনি ও সালাম বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট হয়ে ভেতরেই তারা মারা যান। ফায়ার সার্ভিস যখন তাদের উদ্ধার করে, শরীফ তখন সঙ্গে ছিলেন। তিনি দাবি করেন, দুজনের শরীরে আগুনের কোনো ক্ষত ছিল না। মূলত ধোঁয়ার কারণেই দম আটকে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
১৪ তলার বাসিন্দা জারিনের ভাষ্য, তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন লাগার খবর জানতেনই না। পাশের ফ্ল্যাট থেকে ফোন করে জানানোর পর তারা হুড়মুড় করে সবাইকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসেন। একই তলার বাসিন্দা মো. মহীউদ্দীন। তিনি জানান, চিৎকার শুনে দরজা খুলেই দেখেন চারদিকে শুধু ধোঁয়া। কোনো রকমে নিজেকে বাঁচাতে নিচে নেমে আসেন তিনি।
জানা যায়নি আগুনের সূত্রপাতঃ
আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন ভবনটির বাসিন্দারা। মহীউদ্দীনের মতে, আগুনের উৎপত্তি নিচের তলার গ্যাসের চুলা থেকে হতে পারে। তবে আগুন লাগা ফ্ল্যাটের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সেখানে গ্যাসের লাইন দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ। তাই জনি ও সালাম বাইরে থেকে খাবার এনে খেতেন। তাদের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে এই আগুন লাগতে পারে। কক্ষগুলোতে কাঠের ইন্টেরিয়র থাকায় দ্রæত ও তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ে আগুন।
ফায়ার সার্ভিসের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার রাফি আল ফারুক বলেন, কীভাবে আগুনের সূত্রপাত এখনো জানা যায়নি। তবে এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত রিপোর্টে জানা যাবে অগ্নিকান্ডের কারণ।



