দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন। ছেলের স্মৃতি মনে পড়লেই এখনও চোখ ভিজে ওঠে তার। পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচানোর স্বপ্ন দেখতেন আবু সাঈদ। উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরি করে সংসারের হাল ধরবেন—এমন প্রত্যাশাই ছিল পরিবারের। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। সেই ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে পরিবার।
মকবুল হোসেন বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য শুনেই ছেলে ক্ষুব্ধ হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘একদিন টিভিতে দেখলাম হাসিনা বলছে, মুক্তিযোদ্ধার ছেলে-নাতিপুতিরা চাকরি পাবে, না কি রাজাকারের ছেলে চাকরি পাবে। তখন আবু সাঈদ বলছিল, যদি এক কোটি মানুষ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হয়, তাহলে বাকি ১৫ কোটি মানুষ কি রাজাকার? এই কথাতেই মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে যায়। পরে ছেলে মনে করল, লেখাপড়া করেও চাকরি হবে না। তাই বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলনে যোগ দেয়।’
তিনি জানান, পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়েই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন আবু সাঈদ। এমনকি বাড়ির আশপাশের লোকজনকেও বলে দিয়েছিলেন, আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়টি যেন পরিবারকে না জানানো হয়। পরে তিনি আন্দোলনের ছাত্র সমন্বয়কের দায়িত্বও পালন করেন।
১৬ জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মকবুল হোসেন বলেন, ‘সেদিন সকালে আবু সাঈদ ভাতও খায়নি। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। একাই পুলিশের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল। পুলিশ গুলি করে তাকে হত্যা করে। আমরা ইন্টারনেটে দেখেছি, তিনটি গুলি লাগার পর সে মাটিতে পড়ে যায়, আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি।’
তিনি বলেন, ‘এর আগে পাশের বাড়ির লোকজন কান্নাকাটি করছিল। পরে তারা জানাল, আমার আবু সাঈদ মারা গেছে। খবরটা শুনে মনে হলো আকাশ ভেঙে মাথায় পড়েছে। আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়েছিলাম। আল্লাহ আমাকে হার্ট অ্যাটাক থেকে বাঁচিয়েছেন।’
ছেলের অপূর্ণ স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ওর বোন বলত, ভাই বিসিএস করবে। আবু সাঈদ হেসে বলত, তোমার সেই আশাও পূরণ করব। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হলো না। নিষ্ঠুরভাবে পুলিশ গুলি করে আমার ছেলেকে হত্যা করেছে।’
মকবুল হোসেন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘নিষ্ঠুর পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যে রায় হয়েছে, তা দ্রুত ও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হোক। আমি বাঁচি থাকতে যেন সেই রায় বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারি।’



