জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ ও ড. আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস। শনিবার দুপুরে রাজধানীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘ আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে এ রাজনৈতিক জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এখন থেকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের কোনো কর্মসূচিতে খেলাফত মজলিস অংশ নেবে না।
দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুল হাফিজ কাসরু স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। তবে ভবিষ্যতে বৃহত্তর স্বার্থে কোনো রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজন হলে তা বিবেচনা করা হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামুনুল হককে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, ১১ দলীয় জোটের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করছিল খেলাফত মজলিস। বিশেষ করে জামায়াতের পক্ষ থেকে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ ছিল তাদের।
সূত্র জানায়, প্রায় ২০ বছর আগে খেলাফত মজলিস ভেঙে দুটি দল হলেও নির্বাচনের আগে বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে তারা ১১ দলীয় ঐক্যে যুক্ত হয়েছিল। তবে জোটে জামায়াত সবসময় মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন দলের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছিল খেলাফত মজলিস।
দলটির নেতাদের অভিযোগ, ড. আহমদ আবদুল কাদেরসহ খেলাফত মজলিসের অনেক নেতা থাকলেও তাদের তুলনায় মামুনুল হককে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এমনকি গত নির্বাচনে মামুনুল হকের দলকে জামায়াত বেশি আসন ছেড়ে দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
খেলাফত মজলিসের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, নির্বাচনের আগেই মামুনুল হককে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই তারা জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আগেও বিএনপি জোট ছাড়ে দলটি
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে ছিল খেলাফত মজলিস। তবে ২০২১ সালের শেষ দিকে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির জোট ছাড়ার ঘোষণা দেয়। তখনও বিএনপির বিরুদ্ধে অবমূল্যায়নের অভিযোগ তুলেছিল দলটি।
দলীয় সূত্র জানায়, গত ১৩ জুন চট্টগ্রামে ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশের পর থেকেই জোটের ভেতরে দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে। ওই সময় খেলাফত মজলিসের নাম বা নেতাদের নাম ব্যানার ও প্রচারে ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে রংপুরের একটি সমাবেশে আবারও দলের নাম ব্যবহারের ঘটনায় আপত্তি জানায় খেলাফত মজলিস। এরপর থেকেই জোটের কার্যক্রম থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয় দলটি।
খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী গণমাধ্যমকে বলেন, “নির্বাচন-পরবর্তী সমঝোতার আর কোনো কার্যকারিতা নেই। তাই আমরা এই জোটে আর থাকছি না।”
নতুন কর্মসূচি ঘোষণা খেলাফত মজলিসের
এদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ছাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে খেলাফত মজলিস।
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে বিভাগীয় শহর ও জেলা সদরে গণসমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে এসব কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানিয়েছে তারা।
শনিবার সকালে রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার তৃতীয় সাধারণ অধিবেশনে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন দলের আমির মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ। মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের অধিবেশন পরিচালনা করেন।
সভা শেষে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের মাধ্যমে প্রদত্ত গণরায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে বিভাগীয় শহর ও জেলা সদরে গণসমাবেশ করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যথাসম্ভব প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে খেলাফত মজলিস।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও বিচার দাবি
অধিবেশনে নেতারা অভিযোগ করেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের পূর্ণাঙ্গ রায় পাশ কাটিয়ে সরকার সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করেছে।
তারা সংসদে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, গণরায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
একই সঙ্গে বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা ও জুলাই গণহত্যাসহ ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানানো হয়।
অধিবেশনে শোক প্রস্তাবসহ মোট চারটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। অন্যান্য প্রস্তাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মাদক, সামাজিক অবক্ষয়, স্বাস্থ্য খাতের সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা সংকট, ভারত সীমান্ত ও মুসলিম নির্যাতনসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
অধিবেশনে খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।



