আইসিইউতে প্রায় এক মাস হাতকড়া পরিয়ে চিকিৎসার অভিযোগ; চিকিৎসকদের প্রশ্ন, ‘লাইফ সাপোর্টে থাকা রোগী পালাবেন কীভাবে?’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে থাকা এক আসামির হাতে দীর্ঘদিন হাতকড়া পরিয়ে রাখার ঘটনায় নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ ওই রোগী প্রায় এক মাস ধরে হাতকড়া পরা অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। চিকিৎসকদের ভাষ্য, লাইফ সাপোর্টে থাকা একজন রোগীর পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই; বরং হাতকড়া পরিয়ে রাখায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়েছে।
ওই রোগীর নাম মিজানুর রহমান (৪৮)। তিনি পটুয়াখালী সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পটুয়াখালী জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন। হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলার আসামি হিসেবে তিনি কারাগারে ছিলেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন মিজানুর রহমানের গলায় শ্বাসনালির টিউব এবং নাকে ফিডিং টিউব লাগানো রয়েছে। ডান হাতে অক্সিমিটার সংযুক্ত থাকলেও একই হাতে মোটা রশি দিয়ে হাতকড়া পরানো ছিল।
পরিবারের দাবি, গত ১৪ জুন থেকে তিনি ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই দিন পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
মিজানুর রহমানের স্ত্রী সালমা জাহান অভিযোগ করেন, চিকিৎসকেরা তার স্বামীর সংকটাপন্ন অবস্থার কথা জানিয়ে বারবার হাতকড়া খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। পরে গত সপ্তাহে পুলিশ হাতকড়া খুলে দেয়। এর আগে একাধিকবার অনুরোধ করা হলেও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা নিয়মের কথা বলে তা খুলতে রাজি হননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জানা গেছে, গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর একটি হত্যা মামলায় ঢাকার পল্টন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন মিজানুর রহমান। পরে তাকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে রাখা হয়। সেখানে গত ৯ জুন অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা দিয়ে আবার ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে দায়িত্বরত কয়েকজন চিকিৎসক জানান, মিজানুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন এবং তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। কয়েক দফা অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরিবারের সদস্যদেরও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল।
চিকিৎসকদের মতে, রোগী শুরু থেকেই পালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না। হাতকড়া থাকার কারণে ক্যানুলা স্থাপনসহ চিকিৎসার বিভিন্ন কাজে সমস্যা হয়েছে। পাশাপাশি হাতকড়ার ধাতব অংশও যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত ছিল না।
এ বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, অসুস্থ বন্দির হাতে হাতকড়া পরানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সাধারণত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যরাই পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। তবে চিকিৎসাধীন গুরুতর অসুস্থ কোনো বন্দির হাতে হাতকড়া থাকা কাম্য নয়।
তিনি আরও জানান, ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন ওই রোগীর ক্ষেত্রে এমন ঘটনা সামনে আসার পর দায়িত্বে থাকা কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।



