গণভবনেই সংরক্ষিত হলো জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস; বৃহস্পতিবার থেকে সবার জন্য উন্মুক্ত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি, আত্মত্যাগ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে প্রতিষ্ঠিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল ৯টায় রাজধানীর গণভবনে স্থাপিত এই জাদুঘরের উদ্বোধন করেন তিনি। উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি, সংরক্ষিত নিদর্শন, আলোকচিত্র, দলিলপত্র ও স্মারক ঘুরে দেখেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আমন্ত্রিত অতিথি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
উদ্বোধনের প্রথম দিন জাদুঘরটি শুধুমাত্র আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এটি বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।
ইতিহাসের সাক্ষী গণভবন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। ওই দিন তার সরকারি বাসভবন গণভবনে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এরপর ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
পরবর্তীতে সেই সরকার গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ হিসেবে গণভবনকে একটি স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে জাদুঘরটি চালু হতে সময় লাগলেও অবশেষে এক বছর পর এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলো।
ইতিহাস, দলিল ও সংগ্রামের স্মারক
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাদুঘরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন পর্যায়ের আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, আন্দোলনে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, শহীদদের স্মারক, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান, সরকারি ও বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট নানা নিদর্শন সংরক্ষণ করা হয়েছে।
জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে আন্দোলনের সূচনা, শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি, দেশব্যাপী বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, শহীদদের আত্মত্যাগ, গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায় এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনাপ্রবাহ ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আধুনিক ডিজিটাল ডিসপ্লে, অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রদর্শনীর মাধ্যমে দর্শনার্থীরা আন্দোলনের বিভিন্ন অধ্যায় সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন।
নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ
মঙ্গলবার প্রকাশিত সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। এই সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া এবং আন্দোলনে নিহত ও জুলাই যোদ্ধাদের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতেই এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জাদুঘরটি কেবল স্মৃতি সংরক্ষণের স্থান নয়; এটি গবেষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার হিসেবে কাজ করবে।
শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া জুলাই যোদ্ধা এবং আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা তাদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিচারণ করেন। তারা আন্দোলনের বিভিন্ন মুহূর্ত, আত্মত্যাগ এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরেন।
এ সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং আন্দোলনের সফলতার ইতিহাস নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় গণঅভ্যুত্থানের চেতনা
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের পরিবেশনায় দেশাত্মবোধক গান, আবৃত্তি ও বিশেষ পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। এসব পরিবেশনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং দেশপ্রেমের বার্তা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিজন, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, জুলাই যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার থেকে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে সাধারণ দর্শনার্থীরা নির্ধারিত সময়ে জাদুঘরটি পরিদর্শনের সুযোগ পাবেন। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে।



