ক্যাম্পাসে ১৪৪ ধারা জারির আবেদন, পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের পর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করেছে। একই সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে চিঠি পাঠান।
এদিকে বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। এর আগে সংঘর্ষের জেরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির উভয় পক্ষই একই স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিল। বিকেল ৪টার পর রংপুর মহানগরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা প্রধান ফটকে জড়ো হন। সেখানে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা দেখা যায়। তারা শিবিরবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেন।
তবে একই স্থানে কর্মসূচির ঘোষণা দিলেও ছাত্রশিবির বা তাদের সহযোগী সংগঠনের কোনো নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত হননি।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এক যুবদল কর্মী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে তারা অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, যারা যুদ্ধাপরাধের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তাদের এ দেশে কোনো স্থান নেই।
ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, ক্যাম্পাসে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। বহিরাগতদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। রংপুর মহানগরের নেতাকর্মীদেরও ক্যাম্পাসে না ঢোকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। কেবল শিক্ষার্থীরাই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবেন।
তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি
মঙ্গলবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে জারি করা অফিস আদেশে সংঘর্ষের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাসুদ রানাকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। সহকারী প্রক্টর আব্দুল্লাহ আল মাহবুব সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। অন্য সদস্যরা হলেন বিজয়-২৪ হলের প্রভোস্ট ড. আমির শরীফ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তানজিউল ইসলাম এবং রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. হারুন আল রশিদ।
১৪৪ ধারা জারির আবেদন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সোমবার রাতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষে পাঁচজন গুরুতর আহতসহ অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। মঙ্গলবার উভয় সংগঠনের পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় ক্যাম্পাসে ১৪৪ ধারা জারিতে পুলিশের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

তাজহাট থানার ওসি রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আবেদন পাওয়া গেছে। বিষয়টি পুলিশ কমিশনারকে জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।
প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, সোমবারের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর আবারও দুই সংগঠন কর্মসূচি ঘোষণা করায় পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সাময়িকভাবে ১৪৪ ধারা জারির অনুরোধ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, একটি মহল বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তদন্ত কমিটি নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে এবং তাদের সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংঘর্ষের সূত্রপাত যেভাবে
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে ছাত্রশিবির আয়োজিত ‘জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শিরোনামের একটি ব্যানার প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। ওই ব্যানারে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াতের সাবেক পাঁচ শীর্ষ নেতা এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি ছিল। ছাত্রদল ব্যানারটি অপসারণের দাবি জানালে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি, চেয়ার ছোড়াছুড়ি এবং পরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
রাত ১০টার পর ক্যাম্পাসের বাইরে পার্কের মোড় থেকে কামারের মোড় পর্যন্ত আবারও দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে বেরোবি ছাত্রদলের সহসভাপতি আশিকুর রহমান, বেরোবি ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সোহেল রানা, শিবির-সমর্থিত শিক্ষার্থী পরিষদের ব্রাকসু নির্বাচনের জিএস পদপ্রার্থী মেহেদী হাসানসহ অন্তত পাঁচজন গুরুতর আহত হন। এছাড়া দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষে আরও প্রায় ২০ জন আহত হন।
ঘটনার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা স্বাভাবিক রয়েছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ক্যাম্পাস এবং পার্কের মোড় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।



